ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে রাহিদ খান পাভেল নামে এক শিক্ষার্থীকে ছাত্রশক্তির সদস্যরা বেধড়ক পিটিয়ে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করেছে। পাভেল ঢাবির দর্শন বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
সোমবার (৯ মার্চ) ভোরে বুয়েটে সেহরি খেতে গেলে রাহিদ খানকে মারধরের এ ঘটনা ঘটে।
বর্তমানে পাভেল পুলিশি তত্ত্বাবধানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ঘটনায় অভিযুক্তরা একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, যারা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী।
এ ব্যাপরে ভুক্তভোগী রাহিদ খান পাভেল সাংবাদিকদের বলেন, ‘বুয়েটে সেহরি খেতে গেলে সেখানে ছাত্রশক্তির হাসিব, শুভ, সাইফুল্লাহ, মহিউদ্দিন ও আবরারের সঙ্গে দেখা হয়। পরে তাদের নেতৃত্বে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন আমাকে কোনো কারণ ছাড়াই দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা মারধর করেছে। আমি তাদেরও বলেছি আমার দোষ থাকলে আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হোক। কিন্তু তারা আমার কোনো কথা শোনেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরে সেখান থেকে মেরে আমাকে পলাশীতে এনেও মারে। আবার সেখান থেকে বাইকে করে নিয়ে এসে ভিসি চত্বরে আমাকে কয়েকজন কিল-ঘুষি মারে। পরে, আমার শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়ে গেলে শাহবাগ থানায় ফেলে দিয়ে যায়। সেখান থেকে পুলিশ আমাকে আটক করে। তারা আমাকে ছাত্রলীগ বলে পিটায়। আমি কখনো কোনো সংগঠনে ছিলাম না। আমার কোনো পদ নেই।’
যদিও এখন পর্যন্ত পাভেলের সঙ্গে ছাত্রলীগের কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। এদিকে মারধরে অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ছাত্রশক্তির সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল্লাহ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা হাসিব আল ইসলামকে ফোন দেওয়া হলে তাদের ফোনে পাওয়া যায়নি।
এদিকে শাহবাগ থানার তদন্ত পরিদর্শক আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আজ সেহরির সময় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে। এখন তিনি পুলিশের হেফাজতে আছেন। তার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ হওয়ায় ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তিনি আগে সুস্থ হোক, তারপর তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
অভিযুক্তদের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নেবে কি-না জানতে হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমদ বলেন, ‘অভিযুক্তদের বিষয়ে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
হামলাকারীদের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ
সোমবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে অনুষ্ঠিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে এ ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবি জানানো হয়।
সমাবেশে অংশ নিয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বন্ধু ও ঢাবি শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আকাশ আলী বলেন, ‘পাভেল আমার বন্ধু। খুবই সজ্জন ও পরিশ্রমী একটা ছেলে। পিতাহারা পাভেলকে তার পরিবারের সবকিছু দেখতে হয়। দেখলাম তাকে ছাত্রলীগ সন্দেহে নির্মমভাবে মেরে থানার সামনে ফেলে রাখা হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, সে নাকি ছাত্রলীগ করত এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ৭ মার্চের ভাষণ পোস্ট করেছিল। আশা করেছিলাম জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আমরা অন্যরকম দেশ পেতে যাচ্ছি, সেখানে এখন জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা আজ মলিন হয়ে যাচ্ছে।’
পাভেলকে মারধরের ঘটনায় অভিযুক্তরা হলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হাসিবুল ইসলাম, একই বর্ষের দর্শন বিভাগের সর্দার নাদিম মাহমুদ শুভ, জাতীয় ছাত্রশক্তির সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। সর্দার নাদিম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ছিলেন। পরবর্তী তিনি গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদে যুক্ত হয়েছিলেন।
ওই মানববন্ধনে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সদস্য সচিব ও দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী অদিতি ইসলাম অভিযোগ তোলেন, জাতীয় ছাত্রশক্তির রাজনীতির সঙ্গে জড়িতরা অতীতে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জড়িতদের তদন্ত সাপেক্ষে বিচারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ছাত্রশক্তি যারা এখন করে, তাদের অধিকাংশই আগে ছাত্রলীগ করত। এই প্রচারকদের আমাদের চিনে রাখতে হবে, তাদের সঙ্গে আমরা কোনোভাবেই একাডেমিক কার্যক্রম একসঙ্গে চালাতে পারি না। তাই অবিলম্বে পাভেলের হামলার সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে তদন্ত সাপেক্ষে বিচার আওতায় আনতে হবে।’
ওই মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী ওই বিক্ষোভে অংশ নিয়ে হামলার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানান। এ সময় ‘বিশ্ববিদ্যালয় কি সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য’, ‘পাভেলের উপর সন্ত্রাসী হামলা কেন’, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করো’সহ নানা প্লেকার্ড প্রদর্শন করতে দেখা যায়।
এর আগে সোমবার ভোররাতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) কাজী নজরুল ইসলাম হলের ক্যান্টিনে সেহরি খেতে গেলে পাভেলের সঙ্গে অভিযুক্তদের বাগবিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে পাভেলকে কয়েক দফা পিটিয়ে অভিযুক্তরা শাহবাগ থানায় সোপর্দ করে।
আরিফ জাওয়াদ/সুমন/