আজ ২৬ মার্চ। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) প্রশাসন ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আলোচনা সভা, জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গান, নৃত্য, কবিতাসহ বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছর ২৬ মার্চ সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। এতে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গান-নৃত্য পরিবেশনা এবং কবিতা আবৃত্তি হবে। এ আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ঢাবির সংগীত বিভাগকে। আর নাটক মঞ্চায়নের দায়িত্ব পেয়েছে থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ইতিহাসের ন্যায় অন্তর্ভুক্তিমূলক আয়োজনের ধারায় ফিরে যেতে এবার ছাত্র-শিক্ষক, শিল্পী ও কলাকুশলীদের সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য অনুযায়ী স্বাধীনতা দিবসকে ঘিরে এমন বহুমাত্রিক আয়োজন দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছিল। যদিও গত বছর ২০২৫ সালে এ দিবস পালনে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত বিতর্কিত উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খানের আমলে কর্মসূচিতে ছিল উল্লেখযোগ্য কাটছাঁট। সে বছর স্বাধীনতা দিবস মূলত একটি আলোচনা সভার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, যা অনুষ্ঠিত হয় ২৫ মার্চ টিএসসি মিলনায়তনে। ২০২৫ সালের কর্মসূচিতে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটির অনুপস্থিতি বিশেষভাবে আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে। পাশাপাশি স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাংস্কৃতিক আয়োজন দেখা যায়নি। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
আগে ২৫ মার্চ রোকেয়া হলে আলোচনা হতো। বীর মুক্তিযোদ্ধারা এতে আমন্ত্রিত হতেন। শহিদদের স্মরণে পুরো ক্যাম্পাস ১ মিনিট ব্ল্যাক আউট থাকত। রোকেয়া হলের গণকবরে মোমবাতি জ্বালানো হতো। রোকেয়া হলে ধর্ষিত ও শহিদ হয়েছেন যারা তাদের স্মরণ করা হতো। জগন্নাথ হলেও মোমবাতি জ্বালানো আর আলোচনা সভা হতো। ২৬ মার্চ পুরো ক্যাম্পাসে আলোকিত করা হতো। শিক্ষকদের পক্ষ থেকে আলোচনা সভা করা হতো। যারা শহিদ হয়েছেন ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তাদের নিয়ে চিত্রকর্ম প্রদর্শনী হতো। মুক্তিযুদ্ধের ওপর রচনা প্রতিযোগিতা হতো, ডিবেট হতো, বিজয়ীদের পুরস্কার দেওয়া হতো। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পথ থেকে ইউনূস সরকার বন্ধ করে দিয়েছে। এসব কর্মসূচি পালন না হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী শ্রাবণী ইসলাম দিশা। তিনি নিজে এসব কর্মসূচির দায়িত্ব পালন করতেন জানিয়ে খবরের কাগজকে বলেন, ‘ইউনূসের আমলে রাষ্ট্রের এত গুরুত্বপূর্ণ দিবস যথাযথভাবে পালন করা হয়নি। এ বছর জগন্নাথ হলে তো হওয়ার কথা রয়েছে। তবে আমার সাবেক হল রোকেয়া হলে কিছুই হয়নি এ বছরেও। ভেবেছিলাম বিএনপি এই দিবসটি যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালন করবে।’
অন্যদিকে আলোকসজ্জার ক্ষেত্রেও ড. ইউনূসের আমল এবং চলতি বছরে মধ্যে ভিন্নতা লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল ও টিএসসি এলাকায় আলোকসজ্জা করা হয়। অবশ্য মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানিসংকটের কারণে এবারের কর্মসূচিতে আলোকসজ্জা বাদ দেওয়া হয়েছে। জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় ঈদুল ফিতরের আগেই সরকার আলোকসজ্জার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।
এ বছর যানবাহন বরাদ্দের জন্য হলের নামের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। ২০২৫ সালে ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল’-এর নামে বাস বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে বিএনপি সরকারের আমলে- ২০২৬ সালে একই হলের নাম পরিবর্তন করে ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ লেখা হয়েছে এবং এ নামে বাস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
আগে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে ডাকসু থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিতেন নেতারা। বর্তমানে ডাকসুর নেতৃত্বে রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরের নেতারা। এ বছর দিবসটি উপলক্ষে শিবিরের নেতৃত্বাধীন ডাকসু থেকে কোনো ধরনের কর্মসূচি নেওয়ার কথা গতকাল পর্যন্ত জানা যায়নি।
এ বছর অন্য কর্মসূচি: আজ ভোর ৬টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কেন্দ্রীয় ভবন, আবাসিক হল ও হোস্টেলে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অ্যালামনাইরা ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে স্মৃতি চিরন্তন চত্বরে জমায়েত হবেন। ভোর ৬টায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের নেতৃত্বে জাতীয় স্মৃতিসৌধের উদ্দেশে যাত্রা শুরু হবে এবং পরে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন তারা।
দিবসটি উপলক্ষে আজ বাদ জোহর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ মসজিদুল জামিআ’য় শহিদ বুদ্ধিজীবীদের রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হবে। অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা করা হবে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী পরিবারের সন্তানদের মাঝে মিষ্টি বিতরণ করা হবে।
আগামী রবিবার বেলা সাড়ে ১১টায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে ‘মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের তাৎপর্য’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করবেন। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সভায় সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।