মহান মে দিবসের সকালে, নরম আলো এবং হালকা বৃষ্টির ছোঁয়ায় সেজে উঠেছিল সবুজে ভরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। এই রোমাঞ্চকর পরিবেশেই শত শত শিক্ষার্থীর পায়ের ছন্দে সজাগ হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস। প্রত্যেকের টি-শার্টে যৌথভাবে যা লেখা ছিল তা হলো ‘Every Step to Honour Every Worker’।
এই অঙ্গীকারের মাধ্যমে ‘জাকসু রান ২০২৬’ শুরু হয়, যা শ্রমিকদের প্রতি সম্মান জানানোর প্রতিশ্রুতির চিহ্ন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) এই বিশেষ আয়োজনটি মে দিবসকে একটি নতুন অর্থে পূর্ণ করে। নতুন করে গড়েছে মে দিবসে সংহতির ইতিহাস।
জাকসু রান কোনো সাধারণ দৌড় প্রতিযোগিতা ছিল না। এটি ছিল শ্রমজীবী মানুষের প্রতি শিক্ষার্থীদের গভীর সংহতির প্রকাশ। ৫ কিলোমিটার ও ১০ কিলোমিটারের দুটি ক্যাটাগরিতে অংশ নিয়েছিলেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষ।
ছায়াঘেরা পথ ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে অনেকে যেন অনুভব করেছেন- এই পথ কেবল ক্যাম্পাসের রাস্তা নয়, এটি শ্রমের ঘামে ভেজা বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
ঢাকা থেকে আসা অংশগ্রহণকারী সোলাইমান সাকিল বলছিলেন, ‘ভোরের বৃষ্টিতে আবহাওয়া চ্যালেঞ্জিং ছিল। তবু শ্রমিকদের কথা মনে করে দৌড় শেষ করেছি। মনে হচ্ছিল, আমি শুধু নিজের জন্য নয়- তাদের জন্য দৌড়াচ্ছি।’
বৈচিত্র্যের মিলনমেলা
জাকসু রানে অংশ নিয়েছিলেন সহস্রাধিক মানুষ। এখানে একই সারিতে দৌড়েছেন শ্রমিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, নারী-পুরুষ, তরুণ-প্রবীণ। সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাস সেদিন হয়ে উঠেছিল বৈচিত্র্য ও সংহতির জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
আয়োজকরা শ্রমিকদের জন্য কোনো নিবন্ধন ফি রাখেননি। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত ফি ছিল। এই সিদ্ধান্তকে অনেকে শ্রমিকদের প্রতি প্রতীকী সম্মান হিসেবে দেখেছেন।
অংশগ্রহণকারীদের জন্য ছিল ম্যারাথন কিট, মানসম্মত মেডেল, সার্টিফিকেট এবং প্রয়োজনীয় খাবার-পানীয়। বিজয়ীদের জন্য ছিল বিশেষ পুরস্কার।
আয়োজনের অন্তর্নিহিত বার্তা
জাকসু ক্রীড়া সম্পাদক মাহমুদুল হাসান কিরণের মতে, দীর্ঘ ৩৩ বছর পর পুনরায় অনুষ্ঠিত হওয়া এবারের জাকসু রান ছিল ব্যতিক্রম। জাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক স্পষ্টভাবে বললেন, এই আয়োজনের লক্ষ্যই হলো শ্রমিকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন।
তিনি বলেন, ‘শ্রমিকরা আমাদের চারপাশে অবদান রাখেন, কিন্তু তাদের অধিকার প্রায়ই অবহেলিত থাকে। চারপাশে অবস্থানরত কর্মচারীরা শিক্ষকদের মতো প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য অবদান রাখেন। ক্যাম্পাসের কর্মচারীর মৃত্যুর ঘটনাও আমাদের প্রচণ্ড ভাবে নাড়া দিয়েছে। এই রান তাদের সম্মান জানানোর একটি ছোট প্রয়াস।’
জাকসুর ভিপি আবদুর রশিদ জিতু আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘মে দিবস শুধু একটি দিন নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক সংগ্রামের স্মারক। শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে অধিকার থেকে বঞ্চিত। আমরা চাই, নির্বাচিত সরকার তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করবে, যাতে তাদের রাস্তায় নামতে না হয়।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সোহেল আহমেদ এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় প্রগতিশীল চিন্তার জায়গা। শিক্ষার্থীদের এমন উদ্যোগ ক্যাম্পাসে সামাজিক সচেতনতা বাড়ায় এবং ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেয়।’
অংশগ্রহণকারীদের অনুভূতি
তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোসাব্বির হোসাইন বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগর বরাবরই প্রগতিশীল চিন্তার কেন্দ্র। জাকসুর এমন উদ্যোগ আমাদের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা বাড়ায়।’
দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী স্নিগ্ধা পারভীন বলেন, ‘শ্রমিকদের অবদান সবসময়ই অদৃশ্য থাকে। এই রান সেই অদৃশ্য অবদানকে দৃশ্যমান করার একটি প্রচেষ্টা হতে পারে। শ্রমিকরা আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের সম্মান জানানো আমাদের দায়িত্ব।’
মওলানা ভাসানী হলের এক কর্মচারী আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘আমাদের জন্য এমন আয়োজন কেউ করে না। আজ মনে হচ্ছে, আমাদের কথা কেউ ভাবছে।’
এস্টেট শাখার আরেক কর্মচারী মোহাম্মদ সেলিম জানান, ‘এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কর্মচারীদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করে। পারস্পরিক দায়বদ্ধতা বাড়ে।’
সংহতির সেতুবন্ধন
এবারের আয়োজনে বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ। তারা সাইকেলে করে এসে সংহতি জানিয়েছেন, যা দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরও গভীর করেছে।
ঢাকা থেকে আসা অংশগ্রহণকারী মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেনের কথায় উঠে এসেছে পুরো আয়োজনের সারকথা- ‘শ্রমিক না থাকলে আমরাও নেই। আজকের প্রতিটি পদক্ষেপ তাদের জন্য।’
একটি দিনের চেয়ে বেশি কিছু
‘জাকসু রান ২০২৬’ শেষ হয়েছে, কিন্তু এর প্রভাব রয়ে গেছে অংশগ্রহণকারীদের মনে। এটি মনে করিয়ে দেয়- শ্রমের মর্যাদা, ন্যায্য অধিকার ও সামাজিক সংহতি কোনো সাময়িক বিষয় নয়, বরং একটি চলমান প্রক্রিয়া।
মে দিবসের এই আয়োজন নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে- আমরা কি সত্যিই শ্রমিকদের প্রাপ্য সম্মান দিতে পারছি? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয়তো ভবিষ্যতে আরও অনেক এমন উদ্যোগ দেখতে পাব আমরা। জাকসু রান ২০২৬ শুধু একটি দিনের ঘটনা নয়- এটি একটি ঐতিহাসিক সূচনা।
অমিয়/