সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘ডেইলি মেইল ইউকে’-তে নেদারল্যান্ডসের ক্রাউন প্রিন্সেস ক্যাথারিনা-আমালিয়াকে নিয়ে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে বলা হচ্ছে, মাত্র ২১ বছর বয়সী এই তরুণী দ্বিতীয়বারের মতো ভয়ংকর ডিপফেক পর্নো আক্রমণের শিকার হয়েছেন।
এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তার মুখ বসিয়ে ভুয়া ভিডিও তৈরি করা হয়েছে। যা বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ছড়িয়ে পড়েছে। নেদারল্যান্ডস ও এফবিআই যৌথভাবে অভিযানে নেমে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট বন্ধ করেছে। যদিও এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। এ ধরনের সাইবার অপরাধ শুধু ইউরোপ নয়, বিশ্বব্যাপী নারীর নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি।
নারী হিসেবে ডিপফেকের ভয়াবহতা
ডিপফেইক একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি যা বাস্তব ভিডিওর ফুটেজে থাকা ব্যক্তির মুখ বা শারীরিক বৈশিষ্ট্য অন্য কারো সাথে প্রতিস্থাপন করতে পারে। বর্তমানে নারীদের নিয়ে অশ্লীল বা আপত্তিকর কনটেন্ট বানাতে এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। ডিপফেকের মাধ্যমে নারীর ছবি বা ভিডিও থেকে মুখের অংশটুকু কেটে নিয়ে অন্য কোনো নোংরা ছবি বা ভিডিওতে মুখ বসিয়ে ভুয়া পর্নো ভিডিও তৈরি করা যায়।
স্বাভাবিকভাবেই এমন ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে নারীর জীবনে ভয়াবহ সংকট নেমে আসে। পরিবারে অবিশ্বাস, বন্ধু ও সহকর্মীদের মধ্যে সন্দেহ, সমাজে লাঞ্ছনা- সব মিলিয়ে ভুক্তভোগী প্রায় অসহায় হয়ে পড়েন। অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, এমনকি আত্মহত্যার পথও বেছে নেন। অর্থাৎ ডিপফেক কেবল অনলাইন অপরাধ নয়, এটি নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গভীর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডেটা রিপোর্টাল ২০২৫ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ৭৭.৭ মিলিয়ন মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকসহ নানা প্ল্যাটফর্মে তরুণীদের উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সাইবার অপরাধ। ছবি বিকৃত করে ছড়িয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে এখন ডিপফেক ভিডিও তৈরির মতো ভয়ংকর অপরাধও দেখা যাচ্ছে। শুধু আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত নারীরাই নন, বাংলাদেশের সাধারণ তরুণী, ছাত্রী বা কর্মজীবী নারীরাও এমন অপরাধের শিকার হচ্ছেন। এতে সমাজে তাদের বদনাম ছড়িয়ে পড়ছে। এ কারণে অধিকাংশ নারী প্রকাশ্যে অভিযোগ আনতে সাহস পান না, যা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করে।
পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ
Cyber Crime Awareness Foundation (CCAF)-এর সাইবারক্রাইম ট্রেন্ডস-২০২৪ প্রতিবেদন অনুসারে (এপ্রিল ২০২৩-এপ্রিল ২০২৪ সময়ে), সার্বিক সাইবার অপরাধ ১১ দশমিক ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ৫৯ শতাংশ নারী সাইবার অপরাধের শিকার। এ অপরাধগুলোর মধ্যে রয়েছে ছবি/ভিডিওর বিকৃতি বা পর্নোগ্রাফি সম্পর্কিত লঙ্ঘন। এর মধ্যে ১৮-৩০ বছর বয়সী নারীরা প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এদের অনেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। এ ছাড়া শুধু ১২ শতাংশ ভুক্তভোগী নারী তাদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
Cyber Support for Women and Children (CSWC)-এর রিপোর্ট (জানুয়ারি-জুন ২০২৫) থেকে, ৬ মাসে ২৯টি সাইবার হয়রানি রেকর্ড করা হয়, যার মধ্যে এআই-জেনারেটেড অশ্লীল ছবি বা ভিডিও অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে ভুক্তভোগী নারীর ৭৬ শতাংশ ও কিশোরী ২১ শতাংশ। ৭০ শতাংশেরও বেশি ঘটনায় একাধিক ধরনের হয়রানি (যেমন: ব্ল্যাকমেইল, ভিডিও লিক, অশ্লীল উপস্থাপন)।
Cyber Support for Women and Children (CSWC)-এর রিপোর্ট (জানুয়ারি-জুন ২০২৫) অনুযায়ী, ৬ মাসে ২৯টি সাইবার হয়রানির ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে এআই-নির্মিত অশ্লীল ছবি ও ভিডিও অন্তর্ভুক্ত। ভুক্তভোগীদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা ৭৬ শতাংশ এবং কিশোরীদের ২১ শতাংশ। একাধিক ধরনের হয়রানি (ব্ল্যাকমেইল, ভিডিও লিক এবং অশ্লীল উপস্থাপনা) করা হয়েছে ৭০ শতাংশের বেশি।
বাংলাদেশের আইন ও শাস্তি
বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ রোধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ কাজ করছে। এ আইনের আওতায় পর্নোগ্রাফি ছড়ানো, নারীর ছবি বিকৃত করা, ব্ল্যাকমেইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানির মতো অপরাধের ধরন অনুসারে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে।
এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন (আইসিটি আইন)-এর আওতায়ও ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তবে আইন থাকলেও সমস্যা হলো এর প্রয়োগ নেই। ভুক্তভোগীরা অনেক সময় অভিযোগ করতে ভয় পান বা জানেন না কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে। ফলে শাস্তির নজির কম, আর অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়।
ভুক্তভোগীদের করণীয়
ডিপফেক বা অনলাইনে আপত্তিকর কনটেন্টের শিকার হলে নারীদের প্রথমেই শান্ত থাকতে হবে এবং আতঙ্কে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। করণীয় হতে পারে-
প্রমাণ সংগ্রহ: স্ক্রিনশট, লিংক বা ডাউনলোড করা ভিডিও সংরক্ষণ করতে হবে।
অভিযোগ জানানো: পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট বা ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
আইনগত সহায়তা: আইনজীবী বা নারীবিষয়ক সংগঠনের সহায়তা নিতে হবে।
মানসিক সহায়তা: কাউন্সেলিং বা পরিবারের সমর্থন খুবই প্রয়োজন, যাতে ভুক্তভোগী ভেঙে না পড়েন।
যদিও চ্যালেঞ্জ বড়, তারপরও বাংলাদেশি নারীরা থেমে নেই। অনেক তরুণী আজ সাহস করে সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ জানাচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এ ধরনের অপরাধ দমনে আগের চেয়ে সক্রিয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইনের মাধ্যমে সাইবার হয়রানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
একই সঙ্গে বিভিন্ন এনজিও, নারী সংগঠন এবং অনলাইন কমিউনিটি নারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও আইনি সহায়তায় কাজ করছে। বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ নারী এখনো ভয়, লজ্জা ও সামাজিক চাপে ভোগেন।
সামাজিক ও পারিবারিক দায়বদ্ধতা
ডিপফেক বা অনলাইন হয়রানির আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো সামাজিক বিচার, যেখানে ভুক্তভোগী নারীকেই উল্টো দোষারোপ করা হয়। মিথ্যা ভিডিও বা ছবি ছড়িয়ে পড়লে অনেকে বলেন- ‘সে হয়তো অসতর্ক ছিল’, ‘নিজেই হয়তো আপলোড করেছে’ কিংবা ‘এমন কিছু না করলে তো ভিডিও আসতো না’। এসব মন্তব্য শুধু অপরাধীকে আড়াল করে না, বরং ভুক্তভোগীকেই দোষী প্রমাণ করে। তাই পরিবার ও সমাজের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের উচিত ভুক্তভোগীকে দোষারোপ না করে তার পাশে দাঁড়ানো। এ ছাড়া সমাজে সচেতনতা তৈরি করতে হবে যাতে ভুয়া কনটেন্ট দেখে কেউ নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন না তোলে। পাশাপাশি, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রেখে দায়িত্বশীলভাবে প্রতিবেদন করা জরুরি। অপরাধীকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে হবে, কিন্তু ভুক্তভোগীকে নয়। কেননা পরিবার ও সমাজের সহায়তা ভুক্তভোগীর মানসিক শক্তি বাড়ায় এবং অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
সুতরাং ডিপফেক কেবল প্রযুক্তির অপব্যবহার নয়, এটি নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সামাজিক অবস্থানের ওপর সরাসরি আঘাত। নেদারল্যান্ডসের প্রিন্সেস থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সাধারণ তরুণী সবার জন্যই এটি সমান হুমকি। তবে পার্থক্য হলো, আমাদের সমাজে ভুক্তভোগীরা দ্বিগুণ শাস্তি পান প্রথমত অপরাধীর হাতে, দ্বিতীয়ত, সমাজের কটূক্তি ও অবিশ্বাসে।
তাই এখন সময় এসেছে প্রযুক্তি, আইন এবং সামাজিক সচেতনতার সমন্বয়ে একটি নিরাপদ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার। নারীরা যেন নির্ভয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন, যেন তাদের মর্যাদা প্রযুক্তির ফাঁদে বন্দি না হয়, এটাই হওয়া উচিত আমাদের সবার অঙ্গীকার।
তথ্যসূত্র: ডেইলি মেইল ইউকে, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮
/এসএল
.jpg)