বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৫১ শতাংশ নারী। সমাজ ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া সত্ত্বেও দেশের অধিকাংশ নারী আজও গৃহস্থালি কাজের সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ। সম্প্রতি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ‘কেয়ার রেসপনসিবিলিটি অ্যান্ড উইমেনস ওয়ার্ক ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ‘গৃহস্থালি কাজ কীভাবে নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ ও উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত হওয়ার পথ রুদ্ধ করে’ বিষয়টি ওঠে এসেছে। এ প্রতিবেদনের তথ্য ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারীর মেধা ও শ্রমের একটি বড় অংশ এখনো ঘরকেন্দ্রিক থেকে যাচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫-২৪ বছরের নারীরা শ্রমবাজারে অংশগ্রহণে গৃহস্থালি কাজকে প্রধান বাধা মনে করেন। তারা সপ্তাহে গড়ে ২০ ঘণ্টা গৃহস্থালি কাজে ব্যয় করেন, যেখানে একই বয়সী পুরুষরা মাত্র পাঁচ ঘণ্টা কাজ করেন। অর্থাৎ নারীরা চারগুণ বেশি সময় ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকেন। ফলে বাইরে কাজের জন্য সময়, শক্তি ও মানসিক প্রস্তুতি সবই সীমিত হয়ে যায়।
তবে যৌথ পরিবারে বসবাসকারী নারীরা তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা গৃহস্থালি কাজে সহায়তা করায় তারা উৎপাদনমুখী কাজে বেশি সময় দিতে পারেন। কিন্তু বর্তমানে যৌথ পরিবারের সংখ্যা কমে আসায় নারীরা প্রায় একাই সন্তান লালন-পালন, রান্না, ঘরের দেখভালসহ সব দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে অনেক নারী চাকরি বা পেশা ছাড়তে বাধ্য হন।
প্রতিবেদনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- শিশু লালন-পালন নারীর কাজে বড় প্রভাব ফেলে। বাড়িতে যদি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু থাকে, তবে নারীর উৎপাদনশীল কাজে সময় কমে যায়, আর গৃহস্থালি কাজে সময় বেড়ে যায়। একই সঙ্গে মাতৃদুগ্ধ পান করানোর হারও কমছে। দেশে বর্তমানে মাত্র ৫৫ শতাংশ শিশু মায়ের দুধ পাচ্ছে। ডে কেয়ার সুবিধার অভাব, অফিসে শিশুর জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা এবং সামাজিক সমর্থনের ঘাটতির কারণে কর্মজীবী মায়েরা সন্তানের প্রাপ্য যত্ন নিশ্চিত করতে পারছেন না।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও নারীর অবস্থানে পার্থক্য দেখা যায়। প্রাথমিক বা মাধ্যমিক শিক্ষায় বিশেষ ভিন্নতা না থাকলেও উচ্চশিক্ষিত নারীরা তুলনামূলকভাবে বাইরে কাজ করার ক্ষেত্রে বেশি স্বাধীনতা পান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, শিক্ষিত হয়েও অনেক নারী প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের বাইরে থাকছেন। পরিবারের সেবা ও যত্নের দায়িত্ব বহন করায় তারা অফিস, কারখানা বা সংগঠন খাতে কাজ করার সুযোগ হারাচ্ছেন।
বাংলাদেশের শ্রমশক্তি জরিপ (এলএফএস) ২০১৬ অনুযায়ী, নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ বাড়লেও তা মূলত গৃহভিত্তিক কাজের মাধ্যমে ঘটছে, প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান দিয়ে নয়। গ্রামীণ নারীদের ঘরের বাইরের কৃষিকাজে অংশগ্রহণ ২০১০ সালের ৬৪ শতাংশ থেকে ২০১৬ সালে ২১ শতাংশে নেমে এসেছে। তারা কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বা অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে ঝুঁকছেন। শহুরে নারীদের অংশগ্রহণও কমছে।
এতে শুধু নারী নয়, রাষ্ট্রও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক মেধাবী প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী বা পেশাজীবী নারী বিয়ের পর স্বামীর কর্মস্থলে চলে যেতে গিয়ে চাকরি ছাড়েন। কেউ কেউ বিদেশে পাড়ি জমান, কিন্তু সেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় তারা নিজের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারেন না। ফলে নারীর মেধা ও দক্ষতা অপচয় হয়।
এখানে পরিবার ও সমাজের দায়িত্বও কম নয়। যদি গৃহস্থালি কাজের চাপ কমানো যেত, তবে নারীরা সাইড বিজনেস শুরু করতে পারতেন, উদ্যোক্তা হতে পারতেন বা নতুন কিছু শিখে তা কাজে লাগাতে পারতেন। কিন্তু বাস্তবে তাদের ঘরের যাবতীয় কাজ একাই সামলাতে হয়, রান্না-বান্না, সন্তানদের স্কুলে যাওয়া-আসা, পড়াশোনার তদারকি, বয়স্কদের যত্ন সবকিছু। ফলে অফিস থেকে ফেরার পর তাদের আর কোনো শক্তি অবশিষ্ট থাকে না।
কর্মক্ষেত্রে নারীর সুযোগ বৃদ্ধিতে করণীয়
প্রথমত, যৌথ পরিবারের ইতিবাচক দিকগুলো আবার গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। যৌথ পরিবারে থাকলে শিশুদের দেখভাল ও গৃহস্থালি কাজে সহায়তা পেয়ে নারীর কাজের সুযোগ বাড়ে।
দ্বিতীয়ত, নারীর জন্য দশটা-পাঁচটার বাইরে নমনীয় সময়ের কাজ, ফ্রিল্যান্সিং, রিমোট ওয়ার্ক ইত্যাদি সুযোগ তৈরি করতে হবে।
তৃতীয়ত, শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থা নারীবান্ধব ও নিরাপদ করতে হবে, যাতে কর্মজীবী নারীরা ভয়ের কারণে পিছিয়ে না পড়েন।
চতুর্থত, প্রতিটি অফিস, কারখানা ও গার্মেন্টসে মানসম্মত ডে কেয়ার রাখতে হবে, যেখানে প্রশিক্ষিত কর্মীরা শিশুদের যথাযথ যত্ন নেবেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা। সংসার দুজনের, তাই আর্থিক ও গৃহস্থালি দায়িত্বও যৌথ হওয়া উচিত। স্বামী যদি কিছু দায়িত্ব ভাগ করে নেন, তবে স্ত্রী তার অর্জিত শিক্ষা ও দক্ষতা দিয়ে পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সমর্থন দিতে পারবেন।
আজকের দিনে নারীর মেধাকে গৃহবন্দি করে রাখা সম্ভব নয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়েন প্রমাণ করে পরিবারের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য নারীকে কাজ করতে দেওয়াই শ্রেয়। সেই সঙ্গে সমাজকে সচেতন হতে হবে যে, নারীকে কেবল ঘরের দায়িত্বে আবদ্ধ রাখা নয়, বরং তাকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা জাতীয় উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
বাংলাদেশি নারী ধৈর্যশীল, পরিশ্রমী এবং দক্ষ। যদি তাদের সীমাবদ্ধতা দূর করে উৎপাদনমুখী কাজে যুক্ত করা যায়, তবে উপকৃত হবে পরিবার, সমাজ এবং পুরো দেশ। যত দ্রুত আমরা এই সত্যটি উপলব্ধি করব, তত দ্রুত দেশের অর্থনীতি আরও এগিয়ে যাবে এবং ভবিষ্যতের প্রতিবেদনে নারীর গৃহস্থালি ব্যস্ততা আর কর্মসংস্থানের পথে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হবে না।
/এস লুপিন
.jpg)