বাংলাদেশের অগ্রগতির গল্প আজ শুধু অবকাঠামো, শিল্প বা প্রযুক্তির নয় বরং এটি নারীর ক্ষমতায়নের গল্পও। একসময় যে সমাজে নারীরা ছিল পরিবারের ভেতরে সীমাবদ্ধ, আজ সেই নারীরাই দেশের উন্নয়ন, নেতৃত্ব ও নীতি নির্ধারণের স্তম্ভ হয়ে উঠছেন। তাদের শিক্ষা, কর্মদক্ষতা ও সাহসিকতা এখন বাংলাদেশের সামাজিক রূপান্তরের চালিকাশক্তি। এ সাফল্যের পাশাপাশি রয়েছে কিছু কাঠামোগত ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা, যা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, নারীর মর্যাদা ও ক্ষমতায়ন কেবল একটি মানবিক অধিকার নয়, বরং জাতির টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত।
বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে নারীর অগ্রগতি গত এক দশকে অভূতপূর্ব। ইউনেস্কোর ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি হার ৯৮ শতাংশের ওপরে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও এখন ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে, বিশেষ করে প্রযুক্তি ও ব্যবসা শিক্ষায়। এ শিক্ষাগত অগ্রগতি নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। সাম্প্রতিক সময়ে এ সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ প্রায় এক দশকে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। তারা শুধু ক্ষুদ্র ব্যবসা নয়, বরং ই-কমার্স, কৃষি, ফ্যাশন, এমনকি প্রযুক্তি খাতেও নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন। নারীরা এখন নিজেরাই কর্মসংস্থান তৈরি করছেন, অন্য নারীদেরও আত্মনির্ভর হওয়ার সুযোগ দিচ্ছেন।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নারীর মর্যাদার অন্যতম ভিত্তি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশের মাত্র ৪৩.৫ শতাংশ নারী নিজ নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্টধারী ছিলেন, যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। যদিও শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ এখনো পুরুষের তুলনায় অনেক কম। তথাপিও এ হার ক্রমে বাড়ছে। বিশেষ করে গার্মেন্টশিল্পে নারীর অবদান বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে। প্রায় ৪০ লাখ নারী আজ এ খাতে কাজ করছেন। তারা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মূল চালিকাশক্তি। এ খাতের নারীরা প্রমাণ করেছেন- যদি সুযোগ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তবে নারীরা রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির মূল শক্তি হয়ে উঠতে পারেন।
চ্যালেঞ্জ ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা
নারীর উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক নয়- এটি সাংস্কৃতিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রশ্নও। অনেক নারী এখনো পরিবার বা সমাজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা পান না। ২০২৫ সালের শুরুতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামীণ বিবাহিত নারীদের মধ্যে মাত্র ২৩ শতাংশই পারিবারিক সিদ্ধান্তে সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারেন। এ বাস্তবতা দেখায়, আইনি কাঠামো থাকলেও সামাজিক রীতিনীতি ও পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব নারীর অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করছে।
অন্যদিকে, কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা, সমান বেতন ও মাতৃত্বকালীন সুবিধা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। সরকার সম্প্রতি নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে অনেক নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এসব বাস্তবায়নের গতি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন- যদি নারী-পুরুষের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের পার্থক্য দূর করা যায়, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। আইএমএফ-এর ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। অর্থাৎ, নারীর ক্ষমতায়ন কেবল সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনৈতিক শক্তিরও মূল চাবিকাঠি।
ডিজিটাল বাংলাদেশের যুগে নারীরা যদি শিক্ষা, প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা দক্ষতায় আরও এগিয়ে আসেন, তবে তারা কেবল পরিবার নয়, রাষ্ট্রেরও ভবিষ্যৎ নির্মাতা হবেন। ইতোমধ্যে মঞ্জিরা বাশিরের মতো তরুণ নারীরা আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করছেন; সুবহা রহমান এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের প্রথম বাংলাদেশি নারী ম্যাচ কমিশনার হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন। এসব উদাহরণ আমাদের আশাবাদী করে তোলে। তাই আগামী বাংলাদেশে নারীই হবে পরিবর্তনের মুখ্য চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নারীর মর্যাদা ও ক্ষমতায়নের ওপর নির্ভর করছে। একজন নারী যখন শিক্ষিত, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীন হন তখন তার পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবই লাভবান হয়। তাই নারীর উন্নয়নকে আর আলাদা একটি সামাজিক ইস্যু হিসেবে দেখা নয়; এটি জাতীয় কৌশলের অংশ হওয়া উচিত।
সর্বোপরি, নারী-পুরুষের সমান অধিকার না থাকলে জাতির অগ্রগতি অসম্ভব। সে দর্শন নিয়েই আমাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত। আর সে যাত্রায় নারীর মর্যাদা ও ক্ষমতায়নই হবে আগামীর বাংলাদেশের প্রকৃত শক্তি।
/এসএল
.jpg)