কুষ্টিয়ায় গরিবের জন্য বরাদ্দ ওপেন মার্কেট সেলের (ওএমএস) প্রায় ৩৬০ টন গম ‘ভূতে খেয়ে ফেলার’ অভিযোগ উঠেছে। গত ১০ বছর ধরে গম নিয়ে এই অনিয়ম ঘটলেও এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কেউই মুখ খুলতে চান না।
সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে আটা তৈরির জন্য জেলার বিভিন্ন মিলমালিকদের গোডাউনে গম পৌঁছে দেওয়া হয়। প্রতি বস্তায়, বস্তার ওজন বাদে গম থাকার কথা ৫০ কেজি। মিলমালিকদের অভিযোগ, মিলে আনার পর তারা প্রতি টনে ১৪ কেজি করে কম পান। এই গম কোথায় এবং কীভাবে কারা সরিয়ে নিচ্ছে তা নির্দিষ্টভাবে না বললেও অভিযোগের আঙুল তোলা হচ্ছে গোডাউনের কর্মকর্তাদের দিকে।
গত ১০-১২ বছর ধরে এই অনিয়ম চলে আসছে। হয়রানি এড়াতে মুখ খোলেননি মিলমালিকরা। খাদ্য বিভাগের গুদাম কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেট এই কাজ করছে বলে তারা অভিযোগ তুলেছেন। মিলমালিকরা বলছেন, একটি বস্তায় ৫০ কেজি করে গম থাকার কথা। কিন্তু প্রতি বস্তায় কম থাকে ৭০০ গ্রাম। এভাবে প্রতি টনে কম থাকে ১৪ কেজি গম। জেলা খাদ্য বিভাগের দেওয়া তথ্য মতে, জেলায় প্রতি মাসে প্রায় ২২০ টন ডিও হয় প্রতি মাসে। হিসাবমতে প্রতি মাসে ৩ টন এবং বছরে ৩৬ টন গম চলে যাচ্ছে ভূতের পেটে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুষ্টিয়ার ৬ উপজেলার গুদাম কর্মকর্তাসহ জেলা পর্যায়ের আরও কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে বছরের পর বছর এই অনিয়ম হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেননি।
বর্তমান বাজারে প্রতি টন গমের দাম প্রায় ৩৬ হাজার টাকা। সেই হিসাবে প্রতি মাসে ১ লাখ ৮ হাজার এবং বছরে প্রায় ১৩ লাখ টাকার গরিবের গম চলে যাচ্ছে কর্মকর্তাদের পকেটে।
একই সঙ্গে সরকারি গুদাম থেকে চকচকে গম মিলারদের গোডাউনে গেলেও পচা ও নিম্নমানের ভাঙা দানার গম দিয়ে আটা তৈরি করে সরবরাহের প্রমাণও মিলেছে। জেলা খাদ্য অফিসের তথ্যমতে, কুষ্টিয়া জেলায় প্রতি মাসে সরকারি গম বরাদ্দ আসে ২০০ থেকে ২২০ টন। যে মাসে সরকারি ছুটি থাকে, সেই মাসে ২০ টন কম বরাদ্দ আসে। জেলার ১০টি ফ্লাওয়ার মিলের মধ্যে পাক্ষিক সাঁটাই ক্ষমতা অনুযায়ী এসব গম বণ্টন করা হয়ে থাকে। জেলার ৬টি উপজেলার এলএসডি (স্থানীয় খাদ্যগুদাম) থেকে মিলমালিকরা বরাদ্দ অনুযায়ী ডিও উত্তোলন করেন। তবে বেশির ভাগ কুষ্টিয়া সদর ও জগতি এলএসডি থেকে উত্তোলন করেন মিলমালিকরা। সর্বশেষ চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ২২০ টন গম বরাদ্দ আসে জেলায়। এসব গম দেওয়া হয় ১০টি অটো ফ্লাওয়ার মিলের মধ্যে।
মিলমালিক অথবা তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে এসব গম উত্তোলন করা হয়। ট্রাকে বস্তা বোঝাই করে গুদামের স্কেলে পরিমাপ করা হয়। ওএমএস আইন-২০১২ সালের পরিপত্র অনুযায়ী মিলমালিকরা গম উত্তোলনের সময় খালি বস্তার ওজনের সমপরিমাণ গম পাবেন। খাদ্য বিভাগের ভাষায় একে টিআর বলা হয়। তবে কাগজে-কলমে এই গম মিলমালিকরা পেলেও বাস্তবে পান না। ২০ টন গম উত্তোলনে প্রায় ২৮০ কেজি গম কম পান সব মিলমালিক।
জেলার ১০ জন মিলমালিকের মধ্যে প্রায় সবার সঙ্গে এবং খাদ্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার দুজন আটা প্রস্তুতকারক মিলমালিক বলেন, ‘গুদাম থেকে গম নেওয়ার সময় ৫০ কেজির বস্তায় সরবরাহ করা হয়। প্রতিটি খালি বস্তার ওজন হয় ০.৭৩৫ গ্রাম পর্যন্ত। সরকারি বিধান অনুযায়ী ০.৭০০ গ্রাম গম দেওয়ার বিধান আছে। তবে সেই গম আমরা পাই না। এভাবে ২০ টন গম পরিবহন করতে প্রায় ৪০০ বস্তার প্রয়োজন হয়। ৪০০ বস্তার হিসেবে গমের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৮০ কেজি। এভাবে ২২০ টন গম পরিবহনে প্রয়োজন পড়ে ৪ হাজার বস্তা। এই পরিমাণ বস্তার ওজনের গমের পরিমাণ প্রায় ৩ টনের বেশি।’
নাদিম মণ্ডল নামের একজন মিলমালিক বলেন, ‘ওএমএস নীতিমালা অনুযায়ী গমের ডিও উত্তোলনের সময় খালি বস্তার ওজনের সমপরিমাণ গম মিল মালিকদের পাওয়ার কথা। তবে বিগত ১০ বছর ধরে বস্তার ওজনের গম কম পেয়ে আসছেন মিলমালিকরা। এভাবে প্রতি মাসে মিলমালিকরা প্রায় ৩ টন গম কম পেয়ে থাকেন। বিষয়টি নিয়ে কোনো মিলমালিক ঝামেলায় জড়াতে চান না। তাই এ বিষয়টি মুখ বুজে সহ্য করেন। তারা বলেন, ‘বস্তা বিক্রি করে কিছু টাকা হয়, তাতে লোকসান কিছুটা কমে।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মিলমালিকের ছেলে বলেন, ‘ওএমএসের গম পরিবহন থেকে শুরু করে আটা তৈরিতে পদে পদে অনিয়ম হয়। গুদাম কর্মকর্তাদের কাছে জিম্মি মিলমালিকরা। তারা প্রতি বস্তায় ওজনে কম দেন, তার ওপর প্রতি কেজিতে আলাদা ৫০ পয়সা নেন। বস্তার ওজনের গম যদি কোনো মিলমালিক দাবি করেন, সেই পরিমাণ গমের জন্য বাড়তি অর্থ দিয়ে আসতে হয়। তাই ঝামেলা এড়াতে বস্তার ওজনের গম কেউ দাবিই করে না। এভাবে প্রতি মাসে গুদাম কর্মকর্তারা এসব গম বিক্রি করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন।’
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে এ অনিয়ম চলে আসছে। ১০ বছরে প্রায় ৩৬০ হাজার টনের বেশি গম কম পেয়েছেন মিলমালিকরা। এই পরিমাণ গম অন্যত্র বিক্রি করে দিয়েছেন গুদাম কর্মকর্তারা। এ থেকে তারা লুটে নিয়েছেন প্রায় কোটি টাকা।
কুষ্টিয়া খাদ্য বিভাগের সবচাইতে বড় গোডাউন জগতি। এখানকার অনিয়মও সবচাইতে বেশি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এই এলএসডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুশান্ত বিশ্বাস বলেন, ‘বিষয়টি সঠিক নয়, আমি আপনার সঙ্গে দেখা করে বুঝিয়ে বলছি। এসব নিয়ে লেখালেখি করার দরকার নাই। তবে মিলমালিকরা তাদের অপকর্ম ঢাকতে আমাদের ওপর দোষ দিচ্ছেন। টিআরের গম কম দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
জেলা খাদ্য কর্মকর্তা বাবুল হোসেন বলেন, ‘সরকারি বিধির বাইরে কোনো কিছু করার সুযোগ নেই গুদাম কর্মকর্তাদের। তারপরেও বিষয়টি আমার কানে এসেছে। এ বিষয়ে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি করে বিষয়টি তদন্ত করার জন্য বলা হয়েছে। তদন্তে কিছু পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।