লোডশেডিংয়ের কবলে চরম ভোগান্তিতে দেশের মানুষ। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎসংকটে বোরো খেতে সেচ দেওয়া কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। চৈত্রের প্রচণ্ড দাবদাহ, তার ওপর লোডশেডিংয়ে শিশু ও বৃদ্ধরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। ঈদের কেনাবেচায় বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। কোথাও কোথাও তারের সাহায্যে দূরের জেনারেটর থেকে বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে মোমবাতি জ্বালিয়েও রান্না হচ্ছে অনেক পরিবারে। দেশের ১৯টি জেলা থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
রাজশাহীতে অতিষ্ঠ জনজীবন :
চৈত্রের শেষ দিকে এসে রাজশাহীর ওপর দিয়ে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ায় প্রচণ্ড গরমে এমনিতেই অসহনীয় দিনযাপন করছে সবাই। তার ওপর গত কয়েক দিন ধরে বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ জনজীবন। গরমের কারণে দুপুরের পর রাজশাহী শহরের প্রধান সড়কগুলো ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। ক্লান্ত শরীরে গাছের ছায়ায় বসে থাকছেন শ্রমজীবী মানুষ। উপজেলা শহরসহ গ্রামেও দেখা মিলছে একই চিত্র। বিশেষ করে ইফতারের পর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর বিদ্যুৎ এলেও তারাবি নামাজের সময় আবার একই অবস্থা। রাত ১১টার পর থেকে সাহরির আগে একাধিকবার বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা করে। প্রতিবার আধা ঘণ্টা থেকে ১ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে লোডশেডিং হয়।
নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি পিএলসি (নেসকো) রাজশাহী বিভাগীয় অফিসের প্রধান প্রকৌশলী (অপারেশন) মো. জাকির হোসেন খবরের কাগজকে জানান, বিদ্যুতের মেইনট্যানেন্সের কাজ চলমান থাকায় দিনের বেলাতেও লোডশেডিং হচ্ছে। রাতের বেলা বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়ে যায় ও জমিতে সেচপাম্পগুলো পুরোদমে চালানো হয়। তাই বিদ্যুতের ওপর চাপ পড়ে। এ কারণে রাতে লোডশেডিং হয়। রাজশাহী বিভাগের বিদ্যুতের গড় চাহিদা ৩৮৮ মেগাওয়াট, সরবরাহ হচ্ছে ৩৭০ মেগাওয়াট। গত বৃহস্পতিবার রাতে চাহিদা ছিল ৩৭৫ মেগাওয়াট, পাওয়া গেছে ৩৭০ মেগাওয়াট এবং রাত ৯টায় ৪৫০ মেগাওয়াট চাহিদা ছিল, পাওয়া গেছে ৩৮০ মেগাওয়াট।
সিরাজগঞ্জে তাঁতশিল্পে উৎপাদন ব্যাহত:
বোরো মৌসুমে লোডশেডিংয়ের কারণে চলনবিল এলাকায় ধানখেতে সেচ দিতে না পারায় চরম অসুবিধায় পড়েছেন কৃষকরা। এ ছাড়া ঈদ মৌসুমে সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্প এলাকায় কারখানাগুলোতে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। কারখানার মালিকরা ডিজেলচালিত জেনারেটরের সাহায্যে পাওয়ার লুম ও তাঁত কারখানা সচল রাখার চেষ্টা করছেন। রোজার দিনে সাহরি ও ইফতারের সময় বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার মাত্রা অতিরিক্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
.jpg)
লোডশেডিং তাঁত কারখানা বন্ধ, ছবিগুলো গতকাল সোমবার দুপুরে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার চালা এলাকা থেকে তোলা হয়েছে। সিরাজুল ইসলাম শিশির
খুলনায় চরম ভোগান্তি:
শহরে প্রতিদিন ৫-৬ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশু ও বৃদ্ধরা। লোডশেডিংয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিভিন্ন কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎনির্ভর কম্পিউটারের দোকানগুলোতে দীর্ঘসময় সব কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। পল্লীবিদ্যুতের আওতায় বিভিন্ন উপজেলায় লোডশেডিংয়ে ভোগান্তি আরও বেশি। সন্ধ্যার পর থেকে ভোররাত পর্যন্ত দফায় দফায় লোডশেডিং হতে থাকে। ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো)’র নির্বাহী পরিচালক মো. শামসুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, খুলনা-বরিশালসহ ওজোপাডিকোর আওতায় ২১ জেলায় শনিবার বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৭৫০ মেগাওয়াট। এর সঙ্গে পল্লীবিদ্যুতের আওতায় বিভিন্ন উপজেলা মিলিয়ে ২১ জেলায় মোট চাহিদা ছিল ১৯০০ মেগাওয়াট। সেখানে সরবরাহ পাওয়া গেছে ১৫০০ মেগাওয়াট।
চট্টগ্রামে দিনের শুরুতে ও শেষে লোডশেডিং:
গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার দুই দিন ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় ১২ বার যাওয়া-আসা করে বিদ্যুৎ। দিনের শুরু ও শেষ হয় লোডশেডিংয়ে। চট্টগ্রামের উৎপাদন এবং লোডশেডিংয়ের ব্যাপারে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তবে ইফতার ও সাহরির সময় প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বেড়ে যায় লোডশেডিং। চট্টগ্রামের ১৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে সরবরাহ রয়েছে ১২০০ মেগাওয়াট।’
বাগেরহাটে ৫ থেকে ৬ বার লোডশেডিং:
একদিকে চৈত্রের দাবদাহ, অন্যদিকে ঘন ঘন লোডশেডিং। এর ফলে দৈনন্দিন কাজকর্ম, কারখানার উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বাগেরহাটে দিনে ও রাতে অন্তত ৫/৬ বার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে আরও বেশি। বাগেরহাট পশ্চিমাঞ্চলীয় বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থার নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক খবরের কাগজকে বলেন, এখানে ২০ হাজার গ্রাহক রয়েছে। দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ৭ মেগাওয়াট। পাচ্ছি মাত্র সাড়ে চার মেগাওয়াট। দিনে ও রাতে ৩ থেকে ৪ বার লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করা হয়।
বরিশালে হাঁপিয়ে উঠেছেন নগরের মানুষ:
সপ্তাহ ধরে বরিশাল নগরীসহ বিভাগের ৬ জেলায় বিদ্যুতের লোডশেডিং অসহনীয় মাত্রায় বেড়েছে। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে হাঁপিয়ে উঠেছে বরিশাল নগরের মানুষ। ভয়াবহ অবস্থা গ্রামগঞ্জে। সেখানে দিনের অর্ধেকেরও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকে না। দ্রুতই সমাধান হওয়ার কথা জানিয়েছেন ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) বরিশাল পরিচালন ও সংরক্ষণ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আব্দুল মজিদ। তিনি জানান, বর্তমানে যে লোডশেডিং হচ্ছে তা নিয়মিত লোডশেডিংয়ের অংশ। হঠাৎ তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ঈদকে সামনে রেখে জেলা, উপজেলা সদরে বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি হওয়ায় চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সন্ধ্যা থেকে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল মহানগরসহ বিভাগের ছয় জেলায় প্রতি দিনের গড় চাহিদা রয়েছে ৫৪৬ মেগাওয়াট। পাওয়া যাচ্ছে ৩৬০-৪০০ মেগাওয়াট। ঘাটতি থাকছে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট। ফলে প্রতি একঘণ্টা পর পর লোডশেডিং হচ্ছে।
পটুয়াখালির লোডশেডিং:
পটুয়াখালী জজকোর্ট এলাকায় প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত প্রচুর কম্পোজ ও ফটোকপি হয়। কিন্তু বর্তমানে প্রায় সময় লোডশেডিংয়ের কারণে ফটোকপি ব্যবসায়ীরা অলস সময় পার করেন। হাসিবুর রহমান

যশোরে ঘন ঘন লোডশেডিং:
জেলার চেয়ে উপজেলা পর্যায়ে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে। গত সপ্তাহে তাপমাত্রা ছিল গড়ে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তীব্র গরমের মাঝে বিদ্যুতের লুকোচুরিতে অতিষ্ঠ জনজীবন। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিরক্ত মানুষ। গ্রামে ব্যাহত হচ্ছে সেচ কার্যক্রম। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের বিতরণ বিভাগ-২ এর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী দ্বীন মহম্মদ মহিন খবরের কাগজকে জানান, এলাকায় দৈনিক চাহিদা ৬১ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ ৪৯ মেগাওয়াট। ফলে কিছু সময় লোডশেডিং হচ্ছে। যশোর পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির আওতায় উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলে রাতে বিদ্যুৎ চাহিদা থাকে ১৫৫ মেগাওয়াট। সরবরাহ মাত্র ১১২ মেগাওয়াট। দিনের বেলায় চাহিদা ১৩৮ মেগাওয়াট, সরবরাহ ১০১ মেগাওয়াট।
গাইবান্ধায় টানা ৫০ মিনিট করে লোডশেডিং:
শহরে একটানা ৫০ মিনিট করে লোডশেডিং হচ্ছে। তারাবির নামাজ ও ঈদের কেনাকাটার সময়ে হঠাৎ লোডশেডিংয়ে বিপাকে পড়তে হয় তাদের। আইপিএস, ইউপিএস এবং জেনারেটরনির্ভর হয়ে গেছে সবাই। গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং আরও বেশি। কর্তৃপক্ষ বলছে, শিগগিরই লোডশেডিং কমে আসবে। পল্লী বিদ্যুতের পলাশবাড়ী, গাইবান্ধা সদর, গোবিন্দগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি প্রতিদিনের বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ৫৫ মেগাওয়াট। ৪ লাখ ৮০ হাজার গ্রাহকের বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এ সময়ে ঘাটতি ছিল ১০ মেগাওয়াট। জেলায় নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (নেসকো) দুটি ফিডার রয়েছে। ফিডার-১ এ চাহিদা ১৪ মেগাওয়াট, এর বিপরীতে ৭ মেগাওয়াট সরবরাহ করা হচ্ছে, ঘাটতি থাকছে ৭ মেগাওয়াট, ফিডার-২ এ চাহিদা ৯ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ রয়েছে ৫ মেগাওয়াট। ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকছে। নেসকোর ফিডার-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসিফ জানান, তাপমাত্রা বেড়েছে। অন্যদিকে ঈদের বেচাকেনায় শপিংমলগুলো অনেক রাত অবধি খোলা থাকে। চাহিদার শতকরা ৫০ ভাগ সরবরাহ রয়েছে।
লক্ষ্মীপুরে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং:
জেলায় চাহিদার তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাচ্ছে। ফলে জেলার সবকটি উপজেলা শহর এবং হাটবাজারে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং হচ্ছে। সাহরি, ইফতার ও তারাবির নামাজের সময়ও বিদ্যুতের লোডশেডিং থাকায় জনগণের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় ঠিকমতো পানি সরবরাহ হচ্ছে না। এতে অজু, গোসল ও রান্নাবান্নাসহ দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। লক্ষ্মীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম তাজুল ইসলাম জানান, দৈনিক ১১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ সর্বোচ্চ ৮০ মেগাওয়াট।
মাগুরায় সেচকাজ বিঘ্নিত:
ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কারণে বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্রের মাধ্যমে সময়মতো বোরো ফসলের জমিতে পানি সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই অতিরিক্ত খরচে ডিজেলচালিত শ্যালো ইঞ্জিনের মাধ্যমে জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, এখানে চাহিদা প্রতিদিন ১৪ মেগাওয়াট, সরবরাহ সর্বোচ্চ ১২ মেগাওয়াট। লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে এ ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে।
ময়মনসিংহে ৭-৮ ঘণ্টা লোডশেডিং:
জেলার অনেক এলাকায় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এতে জনজীবন নাজেহাল হওয়ার পাশাপাশি বিঘ্নিত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া। জমিতে চাহিদামতো সেচ দিতে না পারায় বেশ কিছু এলাকার উঠতি বোরো ফসলের খেত ফেটে যাচ্ছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে মরে যেতে পারে ধানগাছ। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ময়মনসিংহের প্রধান প্রকৌশলী মো. এমদাদুল হক বলেন, এখানে পিডিবির বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে প্রায় ১ হাজার ২২০ মেগাওয়াট। পাওয়া যাচ্ছে ১ হাজার মেগাওয়াট। ঘাটতি থাকছে প্রায় ২২০ মেগাওয়াট। ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ কেন্দ্রের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, জেলায় তিনটি অঞ্চলে চাহিদা রয়েছে ২২০ মেগাওয়াট। পাওয়া যাচ্ছে ১৫০ মেগাওয়াট।
নড়াইলে গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং:
নড়াইলে প্রচণ্ড গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং। প্রতিদিন তারাবির সময় লোডশেডিং হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুতের আওতায় গ্রামগুলোতে অর্ধেকের বেশি সময় লোডশেডিং থাকছে। কালিয়া পল্লী বিদ্যুতের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ইকবাল আহম্মেদ বলেন, পিক আওয়ারে চাহিদা ১৬ মেগাওয়াট, অফ পিক আওয়ারে ১২ মেগাওয়াট। সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে পিক আওয়ারে ১০ মেগাওয়াট, অফ পিক আওয়ারে ৯ মেগাওয়াট।
লোহাগড়া পল্লী বিদ্যুতের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার আশরাফুজ্জামান বলেন, গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে পিক আওয়ারে ১৩ মেগাওয়াট, অফ পিক আওয়ারে ৯ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অর্ধেকেরও কম।
নরসিংদীতে জেনারেটর সার্ভিস:
ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি থেকে রক্ষা পেতে নরসিংদীতে জেনারেটর সার্ভিস চালু হয়েছে। লোডশেডিংয়ের সময় দোকানপাট ছাড়াও বাসাবাড়িতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে জেনারেটরের মাধ্যমে দূর-দূরান্ত থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। দোকানপাট ও বাসাবাড়ির মালিকরা উচ্চমূল্যে জেনারেটরের বিদ্যুৎ কেনেন। মাধবদী শহরে জেনারেটর সার্ভিস দেন জামাল বাদশা। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘এখন জ্বালানি তেলের দামও বেশি। রমজান মাসে ব্যবসায়ীদের কথা বিবেচনা করে আমরা চেষ্টা করি লোডশেডিং হলে জেনারেটর সার্ভিস ভালো দিতে।’ নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার শেখ মানোয়ার মোরশেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় সরবাহ কম। তাই বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।’
রাজবাড়ীতে দুরবস্থা:
কয়েক দিন ধরেই রাজবাড়ীতে বিদ্যুতের দুরবস্থা বিরাজ করছে। শহরের চেয়ে গ্রামে সমস্যা বেশি। সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের লোডশেডিং থাকার কারণে ঈদের কেনাকাটা করতে ক্রেতার উপস্থিতি কম। ব্যবসায়ীরা অস্বস্তিতে আছেন। রাজবাড়ী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন অর রশীদ বলেন, জেলায় মোট বিদ্যুতের চাহিদা ৭০ মেগাওয়াট। গত দুই দিন ধরে ৫৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অর্ধেক দিতে হয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে। বাকি বিদ্যুৎ দিয়ে ওজোপাডিকোর গ্রাহকদের চাহিদা মেটানো হয়। যে কারণে লোডশেডিং চলছে।
সিলেটে মোমবাতি জ্বালিয়ে রান্না:
সিলেট নগরীর মদিনা মার্কেট এলাকার গৃহিণী তাসমিনা বেগম মাছ কাটা শেষে সবজি কাটা শুরু করেছেন, তখনই বিদ্যুৎ চলে গেল। পরে মোমবাতি জ্বালিয়ে রান্না শুরু করেন। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাত ১২টায় বিদ্যুৎ চলে যায়। ঘণ্টাখানেক পর বিদ্যুৎ এলেও ১০ মিনিটের ভেতর আবার বিদ্যুৎ চলে যায়। পরে মোমবাতি জ্বালিয়ে রান্না শেষ করেছি। কারণ সারা দিন বিদ্যুৎ থাকে না, তাই চার্জলাইটেও চার্জ নেই। রাত সাড়ে ৩টায় বিদ্যুৎ আসে। সাহরি খাওয়া শেষ করে বিছানায় ঘুমাতে গিয়েছি তখন আবার বিদ্যুৎ চলে যায়।’ তাসমিনার মতো এমন ভোগান্তি সিলেটের সব পরিবারেই। অতিষ্ঠ হয়ে গত মঙ্গলবার রাতে সড়ক অবরোধ করেন ওসমানীনগরের বাসিন্দারা। এর আগে ৩১ মার্চ রাতে দক্ষিণ সুরমা বড়ইকান্দি এলাকার বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-৩-এর কেপিআইভুক্ত কন্ট্রোল রুমে প্রবেশ করে সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-৩-এর সহকারী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানাকে মারধর করেন স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর রায়হান হোসেনের নেতৃত্বে কয়েকজন ব্যক্তি।
টাঙ্গাইলে প্রায় ২০ ঘণ্টা লোডশেডিং:
গ্রামে গ্রামে ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় জনজীবনে ভোগান্তি এখন চরমে। রমজানের প্রতিদিন সাহরি ও ইফতারের সময়েও বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়ায় স্থানীয় জনতা ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন। টাঙ্গাইল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) শেখ মোহাম্মদ আলী খবরের কাগজকে বলেন, এই জোনে পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা ৬ লাখের বেশি। এলাকায় ছোট-বড় মিলে ৪৫০টি শিল্প-কারখানাসহ ও আবাসিক গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ১৬০ থেকে ১৬৫ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ ১০০ থেকে ১০৫ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং বেড়েছে।
মাদারীপুরে আইপিএস ও চার্জার ফ্যান বিক্রি বেড়েছে:
জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে চার্জার ফ্যান ও আইপিএস বিক্রি বেড়েছে। সৌর বিদ্যুতের প্যানেলের বিক্রিও বেড়েছে। শিবচর পৌর বাজারের দেশ ইলেকট্রনিক্সের স্বত্বাধিকারী কাওসার আহমেদ খবরের কাগজকে জানান, গত কিছুদিন ধরে বিভিন্ন সাইজের চার্জার ফ্যানের বিক্রি বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে আইপিএস বিক্রি। মাদারীপুর পল্লী বিদ্যুতের জেনারেল ম্যানেজার মো. জোনাব আলী খবরের কাগজকে বলেন, ৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে পাচ্ছি ৭০ থেকে ৭২ মেগাওয়াট। এ অবস্থায় সন্ধ্যার পরে লোডশেডিং দেওয়া হয়।
নওগাঁয় ধানের জমি চৌচির:
ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ফসলে সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ধানের জমি পানির অভাবে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। নদী ও জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ার ফলে কোথাও সেচ মিলছে না। নওগাঁ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ও নেসকোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি।
নেত্রকোনায় সেচের অভাবে হাওরে ফসল নষ্ট:
ঘন ঘন লোডশেডিং ও প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের অভাবে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার খুরশিমূল গ্রামের কৃষক অজয় দাস জানান, গ্ৰামে পল্লী বিদ্যুৎ ঠিকমতো আসে না। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বোরো ধানের জমিতে গরমে সেচ দিতে সমস্যা হচ্ছে। এতে উঠতি বোরো ধান রোগাক্রান্ত হয়েছে। ডিঙ্গাপোতা হাওরে কোথাও কোথাও ধানে চিটা দেখা গেছে। ফসল নষ্ট হওয়ায় কৃষকরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। নেত্রকোনা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান মাহমুদ এলাহী জানান, টানা দাবদাহে ও রমজান মাসে সাহরি ও তারাবির নামাজের কারণে বিদ্যুতের প্রযে়াজন অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।

সিলেটে রমজানের শুরুতেই লোডশেডিং :
সিলেটে রমজান মাসের শুরু থেকেই লোডশেডিং শুরু হয়েছে। ফলে নগরবাসীকে অন্ধকারেই সারতে হয় ইফতার ও সাহরি। শনিবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে বিদ্যুৎ চলে গেলে মোমবাতি জ্বালিয়ে রান্নার কাজ করেন এক গৃহিণী। ছবিটি নগরীর উত্তর বাগবাড়ি এলাকা থেকে তোলা। ছবি মামুন হোসেন