পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় খুলনার ডুমুরিয়া-ফুলতলা এলাকার এক সময়ের কৃষি নির্ভর বিল ডাকাতিয়া এখন কৃষকের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। চলতি বছরে টানা ভারী বৃষ্টিতে বিলের হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। সেই সঙ্গে রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি, মাছের ঘেরও প্লাবিত হয়।
স্থানীয়রা জানান, বিল ডাকাতিয়ার পানি নিষ্কাশনে সংযুক্ত হরি নদী, হামকুড়া নদী ও ভদ্রা নদী পুরোপুরি ভরাট হয়ে গেছে। ফলে এখানকার বর্ষার পানি বের হতে না পেরে সারা বছর ধরেই জলাবদ্ধতা থাকে। ডুমুরিয়ার শোলমারী নদী দিয়ে এই অঞ্চলের কিছু পানি নিষ্কাশন হলেও পলি পড়ে তাও ব্যাহত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বর্তমানে বিল ডাকাতিয়ার খুলনা অংশে ডুমুরিয়ার ধামালিয়া, রঘুনাথপুর, রুদাঘরা, রংপুর ও গুটুদিয়া পাঁচটি ইউনিয়নের কয়েক হাজার হেক্টর বিলের জমি পানির নিচে তলিয়ে আছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। আয়ের উৎস হারিয়ে অনেকে শহরে দিনমজুরের কাজ করছেন। কেউ ভ্যান চালাচ্ছেন, আবার কেউ খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় যাতায়াতেও দেখা দিয়েছে দুর্ভোগ।
ডুমুরিয়া উপজেলার রংপুর গ্রামের বাসিন্দা লিটন শেখ বলেন, দুই সপ্তাহ ধরে পানিবন্দি অবস্থায় আছি। আমার বাড়িতে কোমর সমান পানি। স্ত্রী, ছোট দুটো বাচ্চা নিয়ে দিনের বেলায় রাস্তার পাশে উঁচু জায়গায় সময় কাটাচ্ছি। রান্না-বান্না, খাওয়া-দাওয়া অনিশ্চিত।
তিন যুগে ধরে বিপর্যয়
বিল ডাকাতিয়ার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা অংশে আশির দশকেও বছরে তিনবার ফসল হতো। কিন্তু ১৯৮৪ সালের বন্যায় বিলটি প্লাবিত হয়। ১৯৯০ সালের পর থেকে এখানে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় ৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘কেজেডিআরপি’ প্রকল্পে ডুমুরিয়ার শলুয়া স্লুইস গেটের মুখ থেকে কৈয়া পর্যন্ত নদী ও কয়েকটি খাল খনন, শোলমারী নদীর মুখে বাঁধ দিয়ে ১০ ভেন্টের স্লুইস গেট তৈরিসহ কয়েকটি কালভার্ট নির্মাণ করে।
এতে বিলে আশার আলো দেখা দিলেও শোলমারী নদীতে পলি জমে অনেকাংশে ভরাট হয়ে যায়। পাশাপাশি কৈয়ার সংযোগ নদীতেও পলি জমে ভরাট ও বিল ডাকাতিয়ার তলদেশ অনেক নিচু হওয়ায় সেখানে ধীরে ধীরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে থাকে।
২০১৪ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘ব্লু গোল্ড’ নামে একটি প্রকল্পের কাজ করা হয়। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে এত টাকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। বিগত তিন যুগ ধরে এই অঞ্চলের কৃষিজীবী মানুষ জলাবদ্ধতার কারণে অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
বিল রক্ষা কমিটির দাবি
ডুমুরিয়া উত্তরাঞ্চল বিল রক্ষা সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক জি এম আমানুল্লাহ জানান, শৈলমারী রেগুলেটরের আওতায় ডুমুরিয়ার বিল ডাকাতিয়াসহ ছোট-বড় ২৪টি বিল আছে।
যার প্রায় শতভাগ চলতি বছরের ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, বিল ডাকাতিয়ার যশোর অংশে পাম্প বসিয়ে পানি নিষ্কাশন করা হচ্ছে। একইভাবে খুলনা অংশে বিল বাঁচাতে দ্রুতই বড় পাম্প বসিয়ে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। শৈলমারী রেগুলেটরের ওপরে এই পাম্প বসাতে হবে। এ ছাড়া মধ্যমমেয়াদি পরিকল্পনায় দুটি ড্রেজার মেশিনের একটা শোলমারী রেগুলেটরের সামনে, অপরটি গ্যাংরাইল নদীতে থাকবে। এতে নদীর নাব্য ঠিক থাকবে ও রেগুলেটরের সামনে পলি জমতে পারবে না। পরে দীর্ঘ মেয়াদে হামকুড়া নদী ও হরি নদী খনন করতে হবে।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এসব নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাথাব্যথা নেই। তারা বাস্তব অবস্থা দেখে প্রকল্প গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করতে নতুন জটিলতা তৈরি হয়। জানা যায়, জলাবদ্ধতার কারণে এবারও বিলের কেউ ধান চাষ করতে পারছেন না। গত বছর পানিতে ভেসে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতিতে মাছ চাষও বন্ধ হয়ে গেছে। চলতি মৌসুমেও হাজার হাজার বিঘা জমি চাষের আওতায় আনা যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) খুলনা অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী জামাল ফারুক জানান, বিল ডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্পের আওতায় বিল ডাকাতিয়ায় ১৮ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে। খাল খননের ফলে শোলমারী স্লুইস গেট দিয়ে পানি নিষ্কাশন হচ্ছে। তবে নদী ভরাট হওয়ায় নিষ্কাশন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। বিলে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান নিয়ে বাস্তবসম্মত প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।