খালের মুখ বন্ধ করে কেউ বানিয়েছেন দোকান, কেউবা আবার বাড়ি যাওয়ার পথ। ফলে পানি বের হতে না পেরে তলিয়ে আছে অর্ধশত একর জমির ফসল। প্রায় ১০ বছর ধরে এ অবস্থা বিরাজ করছে রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের গোপীনাথপুর, কালিকাদহ, রামকৃষ্ণপুর, চর-নারায়ণপুর, বেলিনগর মাঠে।
অপরিকল্পিতভাবে ঘরবাড়ি নির্মাণের কারণেই এ জলাবদ্ধতা বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা। স্থায়ী সমাধানের জন্য তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাজবাড়ী শহররক্ষা বাঁধের কালীতলা মোড় এলাকা থেকে গোপীনাথপুর হয়ে সূর্যনগরের দিকে একটি রাস্তা চলে গেছে। কয়েক বছর ধরে গোপীনাথপুর গ্রামে গ্রামীণ চারটি রাস্তার মোড়ে বেশকিছু দোকানপাট গড়ে উঠেছে। এটিকে বলে গোপীনাথপুর বাজার। এই বাজারের উত্তর দিক দিয়ে চলে গেছে আরেকটি রাস্তা। রাস্তার দুপাশে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ফসলের খেত। এই রাস্তার দুই পাশেই জলাবদ্ধতা। এখনো সেখানে কোমর-সমান পানি। বোঝার উপায় নেই এগুলো ফসলের খেত। মনে হয় বড় কোনো বিল।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রাস্তার দক্ষিণ দিকে খাল ছিল। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ সেই খাল দিয়ে এসব এলাকার পানি বের হতো। পানি বের হওয়ার জন্য খালের মুখে কালভার্টও ছিল। তখন এখানে বছরে তিনটি ফসল হতো। কিন্তু এখন একটি ফসল জন্মানোই কঠিন। ১০ বছর ধরে খাল ভরাট করে দোকান নির্মাণ ও বাড়ি যাওয়ার রাস্তা তৈরি করার কারণে এ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে দুবার করে ধানের চারা রোপণ করেও কোনো সুফল পাননি। এমনকি বোরো মৌসুমেও ফসল তলিয়ে যায়।
এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ধানের খেতের পাশাপাশি তলিয়ে গেছে মুখীকচু ও কলার খেত। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। অনেকেই অভিযোগ করেন, ভারী বৃষ্টি হলেই বাড়িতে পানি উঠে যায়। সেই পানি শুকাতে অনেক দিন সময় লাগে। এভাবেই প্রতিবছর এসব এলাকায় ফসলহানি হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা।
স্থানীয় বাসিন্দা মাজেদা বেগম জানান, তার স্বামী একজন কৃষক। লিজ নিয়ে দুই বিঘা জমিতে আমন আবাদ করেছিলেন। ধান ভালোই হয়েছিল। এখন সব ধান পানির নিচে। বাড়িতেও পানি উঠে যায়। প্রতিবারই আশা নিয়ে ধান রোপণ করেন। আর পানিতে সে আশা ডুবে যায়। পানিতে সব নষ্ট হয়ে গেছে। তার স্বামী এখন ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।
জলাবদ্ধ খেতের পাশে গোপীনাথপুর বাজারে মুদি ব্যবসা করেন আব্দুল মাজেদ। বিষয়টি নিয়ে তিনি খুবই বিরক্ত। তার ১০ পাকি (২৫০ শতাংশ) জমি আছে এখানে। ১০ বছর ধরে তিনি স্বস্তিতে ফসল ফলাতে পারেননি। এবারও বেগুন, পটলসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি রোপণ করেছিলেন। সবই এখন পানির নিচে। আব্দুল মাজেদ জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি অনেকের কাছে সমাধানের জন্য গিয়েছিলেন। কেউ এর সমাধান করেননি। একটি বা দুটি কালভার্ট বানিয়ে পানি বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করলে আর জলাবদ্ধতা হয় না। তারা সবাই জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।
খাল দখল করে দোকান করেছেন এমন একজন মালেক মোল্লা। তিনি বলেন, ‘আমার দোকানের সামনে খালের জায়গা আছে। সরকার সেটি দখলে নিলে আমি ছেড়ে দেব। কিন্তু আমি একলা ছাড়লে পানি বের হবে না। অনেকে বাড়ি যাওয়ার রাস্তা বানিয়েছে। সেগুলোও উদ্ধার করতে হবে।’
রাজবাড়ী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জনি খান বলেন, পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব সাধারণত বিএডিসি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের। সেখানে অপরিকল্পিতভাবে দোকানপাট ও বাড়িঘর করার কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি সব দপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন। আপাতত উপজেলা প্রশাসন পানি বের করার একটা পদক্ষেপ নিয়েছে। স্থায়ী সমাধানের জন্য এলাকাটি সার্ভে করে স্লুইসগেট অথবা কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা পরিষদের সমন্বয় সভায় আলোচনা হয়েছে। অধিক গুরুত্ব দিয়ে তারা বিষয়টি দেখছেন বলে জানান।