রাজশাহী ওয়াসা প্রতিদিন যে পরিমাণ পানি উৎপাদন করে, তার প্রায় ৩০ ভাগ ‘সিস্টেম লস’ (কারিগরি অপচয়) হিসেবে দেখানো হয়। অর্থাৎ কাগজে-কলমে প্রতিদিন ওয়াসার গড় উৎপাদন ১০ কোটি ৭০ লাখ লিটার হলেও ৩ কোটি লিটারেরও বেশি নষ্ট হচ্ছে। এই ‘সিস্টেম লসের’ চক্করে গত পাঁচ বছরে সংস্থাটির ক্ষতি হয়েছে ৪১ কোটি ১২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এতে বিপুল পরিমাণের রাজস্ব হারাচ্ছে ওয়াসা। তবে ওয়াসা বলছে, আগের চেয়ে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীতে সুপেয় পানির জন্য ২০১১ সালে শ্যামপুর এলাকায় ১০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এএইচএম কামরুজ্জামান নামে পানি শোধনাগার নির্মাণ করা হয়। স্থাপনের এক দশক অতিবাহিত হলেও কখনোই এটি পূর্ণাঙ্গ রূপে চালু হয়নি। এর দুটি ইউনিটের মধ্যে একটি চালু থাকলে অন্যটি বন্ধ থাকে। নগরীতে দৈনিক সাড়ে ১৩ কোটি লিটার পানির চাহিদা থাকলেও এই প্রকল্প থেকে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৯০ লাখ লিটার পানি পরিশোধন করা হয়। ফলে চাহিদা পূরণে গ্রাউন্ড ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের মাধ্যমে আরও ৯ কোটি ৮০ লাখ লিটার পানি সরবরাহ করে রাজশাহী ওয়াসা। এতে রাজশাহী মহানগরী এলাকায় বর্তমানে উৎপাদন পর্যায়েই ২ কোটি ৮০ লাখ লিটার পানির ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া সিস্টেম লসে প্রতিদিন তিন কোটি লিটারেরও বেশি পানি নষ্ট হচ্ছে। এতে নগরীতে প্রতিদিন গড়ে পানির ঘাটতি ৫ কোটি ৮০ লাখ লিটার। যদিও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াসার পানি ব্যবহার করে না। তারা নিজস্ব প্রযুক্তিতে নিজেদের মতো করে পানি ব্যবহার করে।
ওয়াসার প্রকৌশলী ও রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত পাঁচ বছর ধরেই ৩০-৩৫ শতাংশ হারে সিস্টেম লস হচ্ছে। সিস্টেস লস হওয়া পানিকে ‘নন-রেভিনিউ’ ওয়াটার হিসেবে চিহ্নিত করে ওয়াসা। এ হিসাবে দৈনিক নন-রেভিনিউ পানির পরিমাণ ৩ কোটি লিটারের বেশি। সিস্টেম লসের বড় কারণ অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে পানি চুরি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের খেয়াল-খুশি মতো অনুমতি ছাড়াই পানির ব্যবহার।
রাজশাহী ওয়াসার তথ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ওয়াসা যে পরিমাণ পানি উৎপাদন করেছে তার ৩৩ দশমিক ৫০ শতাংশই সিস্টেম লস তথা নন-রেভিনিউ হিসেবে হিসাবভুক্ত করা হয়েছে। এতে রাজস্ব হারিয়ে সংস্থাটির ক্ষতি হয়েছে ৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা। একই ভাবে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩২.৯০ শতাংশ নন-রেভিনিউ পানিতে ক্ষতি ৮ কোটি ৮৮ লাখ ৩৩ হাজার টাকা; ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩১.৪০ শতাংশে ৭ কোটি ৫৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩০.৬০ শতাংশে ক্ষতি ৬ কোটি ১২ লাখ টাকা। সর্বশেষ ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে নন-রেভিনিউ পানি দেখানো হয়েছে ২৯. ৪৭ শতাংশ, এতে সংস্থাটির ক্ষতি হয় ৯ কোটি ৮৭ লাখ ৪২ হাজার টাকা। ফলে গত পাঁচ বছরে সিস্টেম লস বা নন-রেভিনিউ পানি থেকে রাজস্ব হারিয়ে ওয়াসার মোট ক্ষতি হয়েছে ৪১ কোটি ১২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।
ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, এক ইউনিট বা এক হাজার লিটার পানি উৎপাদন করতে ওয়াসার খরচ হয় আট টাকা। ওয়াসার সরবরাহ করা এক হাজার লিটার সেই পানির দাম আবাসিক পর্যায়ে ছয় টাকা এবং বাণিজ্যিক পর্যায়ে ১২ টাকা রাখা হয়। কিন্তু নন-রেভিনিউ পানির কারণে প্রচুর টাকা গচ্চা যাচ্ছে। যদিও প্রতিষ্ঠান চালুর শুরু থেকেই সিস্টেম লসের এই ক্ষতি ছিল। শুরুতে এটি ৫০ শতাংশ হলেও ধাপে ধাপে কমে এসেছে। তবু এখনো ৩০ শতাংশের আশপাশেই রয়েছে।
ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরবরাহ লাইনে ত্রুটি ও অবৈধ সংযোগ সিস্টেম লসের বড় কারণ। সিস্টেম লস কমাতে পুরো রাজশাহীকে ডিস্ট্রিক্ট মিটার এরিয়ার (ডিএমএ) আওতায় আনতে হবে। কেননা ডিএমএ চালু হলে কত পানি উৎপাদিত হচ্ছে, কতটা ব্যবহৃত হচ্ছে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে সে হিসাব পাওয়া যাবে। এতে দুর্নীতি কমবে।
রাজশাহী ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী সোহেল রানা বলেন, ‘সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি ওয়াসার অনুমতি ছাড়াই রাস্তা-ভবনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে পানি ব্যবহার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বস্তিবাসীদের মাঝে বিল দিতে অনীহা, পাইপ ফেটে যাওয়া বা লিকেজসহ নানা কারণে পানির সিস্টেম লস হয়। তাই সিস্টেম লসের স্টান্ডার্ড মাপ ১০ শতাংশ হলেও তা বেড়ে যাচ্ছে। তবে এগুলোর পরিমাণ দিনে দিন কমছে।’
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ওয়াসা সিস্টেম লস পাঁচ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারলে পানির দাম বাড়ানোরও যেমন প্রয়োজন হতো না, তেমনি তীব্র গরমেও অতিরিক্ত চাহিদা অনুযায়ী গ্রাহক পর্যায়ে পানি সরবরাহ করা যেত। সিস্টেম লস কমিয়ে আনতে না পারার পেছনে কৃর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মকেই দায়ী করছেন তারা।
‘সুশাসনের জন্য নাগরিক’ রাজশাহী জেলার সমন্বয়ক মিজানুর রহমান বলেন, ‘সিস্টেম লস স্বাভাবিক মাত্রায় রাখতে না পারায় প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এগুলো জনগণের টাকা। তাই সিস্টেম লসের জন্য যারা দায়ী তাদের দৃশ্যমান শাস্তির আওতায় আনতে হবে; যাতে মানুষ সচেতন হতে পারে এবং পানির অবৈধ ব্যবহার থেকে সরে আসে। অন্যথায়, পানির টাকা জলে চলে যাবে।’
রাজশাহী ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকীর হোসেন বলেন, ‘সিস্টেম লস কমাতে এরই মধ্যে ডিএমএ পদ্ধতি চালু করতে মাঠ পর্যায়ে সমীক্ষা করা হয়েছে। গোদাগাড়ী প্রজেক্টের সঙ্গে মার্জ করে ডিপিপির মাধ্যমে এটি করা হবে। ডিএমএ চালু করা সম্ভব হলে সিস্টেম লস কমে যাবে।’
তিনি বলেন, অবৈধ সংযোগ ব্যবহারকারীদের খুঁজে বের করতে আমরা অভিযান চালাচ্ছি। কিন্তু তাদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না। এতে সিস্টেম লস থামানো যাচ্ছে না। তবে এর পরিমাণ আগের চেয়ে কমে এসেছে।