দেশে এখনো সনাতনী পদ্ধতিতে চায়ের গুণগত মান পরীক্ষণ করা হয়। তবে, আধুনিক যুগে এ পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে চায়ের মান যাচাইয়ের জন্য যে প্রথাগত পদ্ধতি অনুসরণ হয়, তা হলো চায়ের রং মুখে নিয়ে কুলি করে ফেলে দেওয়া। এই পরীক্ষার মাধ্যমে চায়ের গুণগত মান নির্ধারণ করা হয়। এটি মূলত নিলামে ওঠা চায়ের বাজারমূল্য নির্ধারণে সাহায্য করে। চা পরীক্ষকরা এ সময় চায়ের রং, উজ্জ্বলতা, ঘনত্ব ও চায়ের স্বাদ পরীক্ষা করেন। তবে, বর্তমানে অনেকেই মনে করেন, চায়ের মান পরীক্ষায় সনাতনী পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক পদ্ধতিতে করা প্রয়োজন।
চা পরীক্ষণের প্রথাগত পদ্ধতিতে পঞ্চ ইন্দ্রিয় ব্যবহার করা হয়। চা মুখে নিয়ে পান না করে কুলি করা হয়। পরে তা পাশের জারে ফেলে দেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে পরীক্ষক তার জিহ্বার মাধ্যমে চায়ের স্বাদ অনুভব করেন। প্রথমে, নির্দিষ্ট পরিমাণ চা পাতা কাপে রেখে গরম পানি দিয়ে রং বের করা হয়। ওই রং মুখে নিয়ে স্বাদ গ্রহণ করে কুলি করা হয়। এরপর দুধ মেশানো হয় এবং চায়ের রং, সুবাস এবং পাতার গুণগত মান পরীক্ষা করা হয়।
শুকনা চা পাতা, তৈরি পাতার রং এবং কোনো অবাঞ্ছিত উপাদান রয়েছে কি না, এসব বিষয়েও পরীক্ষা করা হয়। তবে এই পদ্ধতিতে চায়ে বিষাক্ত কোনো উপাদান থাকলে তা ধরা পড়ে না, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
চা একটি কৃষিজাত পণ্য। এটি উৎপাদন ও প্রসেসিংয়ের সময় বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান প্রয়োগ করা হয়। কৃষকরা সাধারণত চা বাগানে পোকামাকড় এবং রোগবালাই দমন করার জন্য বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করেন। কিন্তু এসব বিষাক্ত উপাদান চায়ের মান পরীক্ষণের পুরোনো পদ্ধতিতে ধরা পড়ে না। চা উৎপাদনে ব্যবহৃত এ রাসায়নিকগুলো মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে এবং দীর্ঘ মেয়াদে ক্যানসারের কারণও হয়ে উঠতে পারে। তাই এই অবস্থায় আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ল্যাব পরীক্ষা প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
টি টেস্টিংয়ের জন্য আলাদা প্রশিক্ষিত পরীক্ষকরা নিয়োজিত থাকেন। চা বাগান থেকে উৎপাদিত পাতা বিভিন্ন ধাপে পেরিয়ে টি টেস্টারের টেবিলে পৌঁছায়। প্রথমে, সবুজ চা পাতা কারখানায় প্রক্রিয়াজাত হয়ে কালো চায়ে পরিণত হয়। পরে ওই চা গুদামে পাঠানো হয়। এরপর নিলামে তোলা চায়ের নমুনা পাঠানো হয় ক্রেতাদের কাছে। পরীক্ষকরা কাপের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ চা রেখে ফুটন্ত পানি ঢেলে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করেন, তারপর চায়ের রং, গন্ধ ও সুবাস পরীক্ষা করেন। এটি চায়ের মান নির্ধারণে সহায়ক হয়। এর ভিত্তিতে চায়ের মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
১৮ বছর ধরে চায়ের মান পরীক্ষা করছেন মোহাম্মদ শাহজাহান। তিনি ন্যাশনাল ব্রোকার হাউসের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জানান, সারা বিশ্বে চায়ের মান পরীক্ষা করার আধুনিক পদ্ধতির প্রচলন নেই। ল্যাবে পরীক্ষা করার মতো কোনো যন্ত্রপাতি এখনো তৈরি হয়নি। তার মতে, পুরোনো পদ্ধতিতেই চায়ের মান নির্ধারণ করা যায়। তবে এটি আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষার সঙ্গে মিলছে না। চায়ের মান মূল্যায়নে এ পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে কার্যকরী হলেও, চায়ে বিষাক্ত উপাদান বা অন্যান্য ক্ষতিকারক উপাদান আছে কি না, তা পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না।
মৌলভীবাজারের ক্লিভডন চা বাগানের উপমহাব্যবস্থাপক জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘চা উৎপাদনে ব্যবহৃত সবুজ পাতা প্রক্রিয়াকরণের পর ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু এক বছর পরপর চা ব্যবহার করা উচিত। তবে, চায়ের মান পরীক্ষা করতে হলে আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং ল্যাবের প্রয়োজনীয়তা এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফ্রান্সে যেখানে চায়ের সব প্যারামিটার পরীক্ষা করা সম্ভব, সেখানে আমাদের দেশে এমন কোনো ল্যাব নেই। ল্যাব স্থাপন এবং পরিচালনার ব্যয় হিসাব করে বাংলাদেশে কিংবা ভারতেও এসব ল্যাব স্থাপন করা হয়নি।’
চট্টগ্রামের হালদা ভ্যালি চা বাগানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাদের খান বলেন, ‘চা প্রকৃতির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল একটি পণ্য। এটি আবহাওয়া, বৃষ্টিপাত ও মৌসুমি পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। তবে, এর মান নির্ধারণের জন্য সনাতনী পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক পদ্ধতিতে পরীক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশের কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি নাজের হোসেনও এই অবস্থার পরিবর্তন চান। তিনি বলেন, ‘চা বাগানগুলোয় ক্ষতিকারক রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। এটি মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এসব রাসায়নিক পরীক্ষণ করার জন্য আধুনিক ল্যাব এবং যন্ত্রপাতির প্রয়োজন। এজন্য চায়ের মান পরীক্ষণ আধুনিক পদ্ধতিতে করা জরুরি। এটি ভোক্তা নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।’