রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে আবার ডাকাতি, অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি, ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়েছে।
হরিণ শিকারিরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। গত বছরে জব্দ হওয়া ৯৫ কেজি ৫০০ গ্রাম হরিণের মাংসের মধ্যে ৫ আগস্টের পর গত ৫ মাসে ৭৮ কেজি হরিণের মাংস জব্দ করা হয়েছে। বনজীবীরা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বা আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে হরিণ শিকার করা হচ্ছে।
এর আগে গত ২৬ ডিসেম্বর গাবুরার চকবারা গ্রামের সবেদ আলী গাজীর ছেলে ইয়াসিন গাজীর বাড়ির ফ্রিজ থেকে ৩ কেজি হরিণের মাংস জব্দ করেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় বসবাস করা ধনী পরিবার ও রাজনৈতিক নেতাদের বাড়ির ফ্রিজে প্রায় সব সময়ই হরিণের মাংস পাওয়া যায়। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের লোকজনও হরিণের মাংসের ক্রেতা। এ মাংস এখন হোম ডেলিভারিও করা হয়। চাহিদা বেশি থাকায় অবৈধভাবে হরিণ শিকারও বেড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ধাপে ধাপে সুন্দরবন অঞ্চলের ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন দস্যু ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২ হাজার ৫০৪টি গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করে। পরে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করা হয়।
তবে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে জেল থেকে পালিয়ে আসা কয়েদি ও চিহ্নিত আসামিরা থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র নিয়ে সুন্দরবনে দস্যুতা ও হরিণ শিকার শুরু করেছে। তাদের একটি অংশ সুন্দরবনের ভারতের অংশে পালিয়ে গেছে বলেও জানা গেছে। সুন্দরবনে ১০-১২ জনের একটি ডাকাত দল বনে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের কাছ থেকে মাছ, টাকা, মোবাইল ফোনসহ সবকিছু লুট করে নিচ্ছে। এমনকি জেলেরা বনে ঢুকলেই তাদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের চাঁদাও দাবি করছে।গত চার মাসে পশ্চিম সুন্দরবনে অন্তত তিনটি অপহরণের ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।
রুবেল হোসেন নামে এক জেলে বলেন, ‘অনেক দিন পর সুন্দরবনে আবার ডাকাত নেমেছে। নদীতে মাছ তেমন হয় না। মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিয়ে ডাকাতির টাকা দেব, নাকি ঋণ শোধ করব?’
আনোয়ার আলী নামের অপর এক জেলে বলেন, ‘আবদুল্লাহ বাহিনী নামে ১০-১২ জনের একটি ডাকাত দল সুন্দরবনের দারগাং, আঠারোবেকী, কাঁচিকাটা, রায়মঙ্গল, কচুখালী, মাওন্দো নদীতে অবস্থান করছে। তারা জেলেদের ধরে নৌকায় যা পাচ্ছে তুলে নিচ্ছে। আবার বনে প্রবেশ করলে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে প্রবেশ করতে বলছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল কয়েকজন জেলে ও মৌয়ালি জানান, গত বছরের জানুয়ারি থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে অনুপ্রবেশ কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এ সময় শিকারিরা অনেকেই অন্য পেশায় চলে যান। তবে ৫ আগস্টের পর বন বিভাগ, কোস্টগার্ড ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় শিকারিরা আবারও বনে ঢুকতে শুরু করেন। এদের মধ্যে বনদস্যু রয়েছে। মাঝেমধ্যে শিকারিরা হরিণের মাংসসহ গ্রেপ্তার হয়। এ ছাড়া ফাঁদ জব্দ করা গেলেও বেশির ভাগ শিকারি ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে যায়।
সুন্দরবন গবেষক পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু বলেন, ‘বন্যপ্রাণী শিকার নিষিদ্ধ হলেও আইন অমান্য করে একটি চক্র হরিণ শিকার করছে। সুন্দরবনে দস্যুতার সঙ্গে সঙ্গে ফাঁদ পেতে ও গুলি করে হরিণ শিকার বেড়েছে। শিকারের পর মাংস ও চামড়া সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করছে। এভাবে অবাধে শিকার করলে সুন্দরবনে বাঘ-হরিণের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের চাপের মুখে জেলেরা বনের ভেতরে ঢুকে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে শুধু মাছ নয়, অনেক জলজপ্রাণিও মারা যাচ্ছে।’
এ প্রসঙ্গে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মশিউর রহমান জানান, সুন্দরবনের হরিণ শিকার বন্ধ, বনদস্যুদের তৎপরতা কমাতে ও বনজীবীদের নিরাপত্তায় বন বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। বন সুরক্ষায় খুব শিগগিরই বন বিভাগ, কোস্টগার্ড, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি যৌথ অভিযান চালাবে।