আমরা বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করিনি। আমরা আমাদের বর্ডারে ছিলাম, তারাই আমাদের ডেকে নিয়ে আমাদের সবকিছু তল্লাশী করেছে। এরপর ছেড়ে দেয়। এর ঘণ্টাখানেক পর তারা আবার আমাদের বলেছে, তল্লাশীর সময় আমাদের ফিশিং বোটে তাদের (ভারতীয় কোস্টগার্ড) একটি আইফোন পড়ে গেছে। আইফোনটা নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদেরকে ফের তল্লাশী করবে। সে কথা বলে তারা আমাদেরকে তাদের বর্ডারে নিয়ে যায়।
এভাবেই ভারতীয় কোস্টগার্ডের হাতে আটক, ভারতের আদালতের মাধ্যমে জেলে যাওয়া, ২৬ দিন জেলে থাকাসহ বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা জানালেন ভারতীয় কোস্টগার্ডের হাতে আটক ‘এফবি লায়লা-২’ নামক ফিশিং ট্রলারের গ্রীজার মো. মঈনুদ্দিন রানা।
গত ৯ ডিসেম্বর সকাল ১০টার দিকে বঙ্গোপসাগরে খুলনায় হিরণ পয়েন্ট এলাকা থেকে নাবিকসহ মাছ ধরার দুটি ট্রলার ভারতীয় কোস্টগার্ড সদস্যরা আটক করে নিয়ে যায়। দুটি ট্রলারের মধ্যে এফবি লায়লা-২ একটি।
মো. মঈনুদ্দিন রানা বলেন, যেহেতু প্রথমে আটক ও তল্লাশী করে আমাদের ছেড়ে দিয়েছে তাই দ্বিতীয়বার আমাদের ক্যাপ্টেন তাদের চালাকিটা ধরতে পারেনি। তারা আমাদের আটকাবে এমনটা জানা থাকলে ক্যাপ্টেন তো ফিশিং বোট তাদের বর্ডারে নিয়ে যেত না। তারা (ভারতীয় কোস্টগার্ড) ক্যাপ্টেনকে বলেছে পশ্চিম দিকে চালাতে। তারপর তারা আমাদেরকে কোস্টগার্ডের (ভারতীয়) আরেকটি দলের কাছে হস্তান্তর করে প্যারাদ্বীপ বন্দরের দিকে নিয়ে যায়। তখন বুঝতে পালাম, আমরা ভারতে চলে গেছি। তখন আমাদের হাহাকার দেখার কেউ নেই।
মনে শঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। একটা ভয় তো ছিলোই। ভারতীয় কোস্টগার্ড যদি না ছাড়ে। আমরা আদৌ দেশে ফিরে আসতে পারব কি না তারও কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, বাংলাদেশ সরকার ও কোস্টগার্ডের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আমরা অনেক দ্রুত দেশে ফিরতে পেরেছি।
ট্রলারে এক কোটি টাকার মাছ ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের ট্রলারে প্রায় এক কোটি টাকার মাছ ছিল। ওগুলা জাহাজেই আছে। ওরা মাছ ধরেনি।
ভারতীয় কোস্টগার্ডের হাতে আটক অপর ফিশিং বোট এফবি মেঘনা-৫। এই বোটের ক্যাপ্টেন রাহুল বিশ্বাস বলেন, গত ৯ ডিসেম্বর ভারতীয় কোস্টগার্ড প্রথমে আমাদের আটক করে। এরপর আমাদের বিষয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞেস করে। ১০ ডিসেম্বর আমরা প্যারাদ্বীপ বন্দরে পৌছাই। ৪ জানুয়ারি সেখান থেকে ছাড়া পাই। তারা আমাদের কোনো প্রকার শারীরিক নির্যাতন করেনি। আমরা স্বাভাবিক ও সুস্থ ছিলাম। তবে যেটা বুঝতে পারলাম, ভারতের ৯৫ জন জেলে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের কাছে আটক ছিল। তাদের উদ্ধার করতেই ইচ্ছাকৃত আমাদের ধরে নিয়ে যায়। অন্য কোনো কারণ ছিল না।
এর আগে গত ১২ সেপ্টেম্বর বঙ্গোপসাগরে আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমার কাছে প্রতিকূল আবহাওয়ায় ডুবে যায় বাংলাদেশি ফিশিং ট্রলার এফবি কৌশিক। ওই ট্রলারে ছিলেন মো. শরীফ মিয়া। তিনি সাত বছর ধরে ফিশিং বোটে মাছ ধরার কাজ করছেন।
শরীফ মিয়া বলেন, গত ৯ সেপ্টেম্বর সকালে কুয়াকাটা মহিপুর থেকে মাছ ধরার উদ্দেশে রওনা হই। আমরা কুয়াকাটা সীমানায় সাগরে জাল ফেলি। আমাদের সঙ্গে আরও দুটি বোট ছিল। গত ১২ সেপ্টেম্বর হঠাৎ আবহাওয়া খারাপ হয়ে যাওয়ায় তারা (দুটি বোট) আমাদের আগে চলে যায়। এদিকে হঠাৎ করে আমার বোট উল্টে যায়। আমরা ১৩ জন ছিলাম। এরমধ্যে একজনকে এখনও খুঁজে পাওয়া যায় নি। বোটে কিছু বাঁশ ছিল। আমরা সেই বাঁশ ধরে পানিতে ভাসছিলাম। সেদিন সন্ধ্যায় ভারতীয় কোস্টগার্ড আমাদের উদ্ধার করে। তারা আমাদের জানায়, আমরা ভারত সীমানায় ঢুকে গেছি। তারা আমাদের নিয়ে যায়।
পানিতে দীর্ঘক্ষণ ভেসে থাকায় তারা অসুস্থ হয়ে পড়েন- একথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা আমাদের ওষুধ, খাবার দিয়েছে। পরে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের সঙ্গে আলাপ করেছে। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ থাকায় বাংলাদেশ কোস্টগার্ড যেতে পারেনি। তাই ভারতীয় কোস্টগার্ড আমাদেরকে ওই দেশের থানায় হস্তান্তর করে। সেখান থেকে আদালতের মাধ্যমে জেলে পাঠায়। আমরা সেখানে তিন মাস ২১ দিন জেলে ছিলাম। তবে অবশেষে দেশে ফিরে আসতে পেরেছি, আমরা এতেই খুশি।
উল্লেখ্য, গত বছরের ৯ ডিসেম্বর সকাল ১০টার দিকে বঙ্গোপসাগরে খুলনায় হিরণ পয়েন্ট এলাকা থেকে নাবিকসহ মাছ ধলার দুটি ট্রলার ভারতীয় কোস্টগার্ড সদস্যরা আটক করে নিয়ে যায়। অভিযোগ ছিল, তারা বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা অতিক্রম করে ভারতীয় সীমানায় প্রবেশ করেছিল।
ট্রলারগুলো হল, এফভি লায়লা–২ ও এফবি মেঘনা–৫। এর মধ্যে এফভি লায়লা–২ এস আর ফিশিং নামে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন। এফভি মেঘনা–৫ চট্টগ্রামভিত্তিক সিঅ্যান্ডএ অ্যাগ্রো লিমিটেডের মালিকানাধীন।
এফভি-মেঘনা ট্রলারটি গত বছরের ২৪ নভেম্বর চট্টগ্রাম থেকে মাছ আহরণের জন্য খুলনায় গিয়েছিল। সেটি ১৪ ডিসেম্বর ফিরে আসার কথা ছিল। ওই ট্রলারে ৩৭ জন নাবিক ছিলেন। অন্যদিকে ৪১ জন নাবিক নিয়ে এফভি লায়লা-২ ট্রলারটি চট্টগ্রাম থেকে রওনা করেছিল গত ২৭ নভেম্বর। সেটি ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ফিরে আসার কথা ছিল।
ভারতীয় কোস্টগার্ড তাদের আটকের পর ট্রলারগুলোর মালিক কর্তৃপক্ষ এবং নাবিকদের স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকন্ঠার সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে গত ১০ ডিসেম্বর রাতে ভারতীয় কোস্টগার্ডের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে তিনটি ছবি প্রকাশ করে বলা হয়, ভারতীয় সমুদ্রসীমায় মৎস্য আহরণের অভিযোগে এক অভিযানে ট্রলার দু’টিসহ ৭৮ নাবিককে আটক করা হয়েছে। নাবিকসহ ট্রলার দুটি প্যারাদ্বীপের কাছে নেওয়া হয়েছে।
মুক্ত হওয়া ৯০ নাবিকের মধ্যে বাকি ১২ জন এফবি কৌশিক নামে একটি মাছ ধরা ট্রলারের জেলে। গত ১২ সেপ্টেম্বর বঙ্গোপসাগরে আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমার কাছে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে নৌ যানটি ডুবে গিয়েছিল। সেখানে থাকা ১২ বাংলাদেশি জেলেকে ভারতীয় ট্রলার উদ্ধার করে নিয়ে গিয়েছিল। তাদের ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কাকদ্বীপে ভারতীয় কোস্টগার্ডের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছিল।
তারেক মাহমুদ/মাহফুজ