হবিগঞ্জের মাধবপুরের রাজখাল। একসময় এই খালে স্থানীয়রা মাছ শিকার করতেন। উপজেলার পাঁচটি হাওরের ফসলি জমির সেচের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল এটি। কিন্তু সেই খালটি এখন কৃষকের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পোড়া মবিলের মতো কুচকুচে কালো রঙ ধারণ করা রাজখালের পানি কোনো ফসলি জমিতে ঢুকলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। মানুষের গায়ে লাগলে চর্মরোগ হচ্ছে। মারা যাচ্ছে হাঁস-মুরগি। বেড়েছে কৃষকের উৎপাদন খরচও। আর সবকিছুর জন্য দায়ী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অপরিশোধিত বর্জ্য।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার হরিতলা এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে তিনটি বহুজাতিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠান তিনটি তাদের উৎপাদিত অপরিশোধিত বর্জ্য পার্শ্ববর্তী খাল দিয়ে নিষ্কাশন করছে। এতে উপজেলাবাসীর এক সময়ের আশীবার্দ রাজখাল এখন গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়রা চাইলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারেন না। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয়দের ম্যানেজ করছে। এমনকি এ বিষয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা ওই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের রোষানলে পড়েন। তবে আশার কথা হলো, পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার সাতপাড়িয়া, খতিয়ারপুর, পিয়াম ও সাকুসাইল গ্রামের মানুষরা সবচেয়ে বেশি দূষণের শিকার হচ্ছেন। তাদেরই একজন জাহাঙ্গীর আলম। বাড়ি সাতপাড়িয়া গ্রামে। খালের অতীত আর বর্তমানকে তুলনা করতে গিয়ে বলেন, ‘এই খালে এক সময় আমরা মাছ ধরতাম। কিন্তু এখন মাছ পাওয়াতো দূরের কথা, দুর্গন্ধের কারণে খালের আশপাশেও যাওয়া যায় না। পানি কুচকুচে কালো।’
একই গ্রামের মোতাহের হুসাইন বলেন, ‘কোম্পানির পচা পানি ছাড়ার কারণে দুর্গন্ধে বাড়িতে থাকা যায় না। হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পানিতে নামলে মারা যায়, অসুস্থ হয়ে যায়। এই পানিতে হাত-পা লাগালে আমাদেরও চুলকায়। কয়েকদিন আগেও আমার গ্রামের এক খামারির ২০০ হাঁস মারা গেছে। এ ছাড়া আমার চাচাত ভাইয়েরও ৭-৮টি হাঁস মারা গেছে।’
আব্দুল কাদির নামে এক কৃষক বলেন, ‘বর্ষায় খালের পানি জমিতে ঢুকে খেতের মধ্যে ক্যামিকেলের লেয়ার পড়ে থাকে। এগুলোর কারণে ফলন হয় না। আবার লেয়ার পরিষ্কার করতে গেলে প্রতি বিঘায় ৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ করতে হয়।’
কৃষক রুক্কু মিয়া বলেন, ‘এই পানি যে জমিতে ঢোকে সেই জমিতে ধান হয় না। আমাদের এলাকায় অনেক জমি আছে সেগুলো অনাবাদি পড়ে থাকে। কিন্তু আমরা প্রতিবাদ করার সাহস পাই না। প্রতিবাদ করলে বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়।’
অভিযোগের প্রমাণও পাওয়া গেছে। প্রতিবেদন সংগ্রহের সময় কারখানার নিয়োজিত তিন দালাল স্পটে হঠাৎ উপস্থিত হন। তার মধ্যে একজন হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদল নেতা এনামুল হক অ্যানি। তার সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় দুই যুবক। এ সময় তারা কারখানার পক্ষে ছাফাই গেয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর উত্তেজিত হন।
ছাত্রদল নেতা অ্যানি বলেন, ‘কারখানা হওয়ায় এ এলাকার উন্নয়ন হচ্ছে। আপনারা এই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে চান। আমি মনে করি আপনারা কোনো বিশেষ সংস্থার (প্রতিবেশী দেশের) এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন।’ এ সময় তারা দূষণ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার হুমকিও দেন।
এদিকে, রাজখাল ও এর আশপাশ এলাকা সম্প্রতি পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের- বাপা নেতারা। এ সময় তারা জানান, দূষণ বন্ধে সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাপার সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, ‘মাধবপুরে দীর্ঘদিন ধরে শিল্পদূষণ হচ্ছে, যা স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। আমরা চাই ইন্ডাস্ট্রি হোক, কর্মসংস্থান হোক। তবে ইন্ডাস্ট্রিগুলো তাদের বর্জ্য পরিশোধন নিশ্চিত করবে, সেটি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তারা তা করছে না।’
সিলেট বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ফেরদৌস আনোয়ার বলেন, ‘হাঁস মারা যাওয়ার পর আমরা রাজখাল থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করি। এ ছাড়া তিনটি প্রতিষ্ঠান থেকে নির্গত পানির নমুনাও নেওয়া হয়। খালের পাশাপাশি একটি কারখানার পানিতে পাত্রাতিরিক্ত দূষণ পাওয়া গেছে। তবে প্রক্রিয়া চলমান থাকায় সেই প্রতিষ্ঠানের নাম এই মুহূর্তে প্রকাশ করতে চাই না। আমরা আমাদের সংশ্লিষ্ট আইনে ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’