চট্টগ্রামে নিলামে চা বিক্রি করে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় বাগান মালিকদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। অব্যাহত লোকসানের কারণে অনেক মালিক তার বাগানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নিলামবর্ষের শেষের দিকে এসে চায়ের দাম কমে যাওয়ায় পুরো বছর বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এমন পরিস্থিতির জন্য তারা তুলনামূলক ছোট চা-চাষিদেরকেও দায়ী করছেন। তবে নিলামকারী প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া হয়েছে ভিন্ন তথ্য। বলা হচ্ছে, নিলামের শেষ দিকে চায়ের দাম কমে থাকে। এ সময় তুলনামূলক কম মানসম্পন্ন চায়ের সরবরাহ বেশি হয়। এ কারণে চায়ের দামও কম।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভালো মানের প্রতিকেজি চা তৈরিতে খরচ হচ্ছে গড়ে ২১৩ টাকা। কিন্তু সেই চা নিলামে বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকায়। সর্বশেষ ৩৮তম নিলামে চায়ের দাম ওঠে ১৯৭ টাকা। এর আগের ৩৭তম নিলামে বিক্রি হয়েছিল ১৯৬ টাকায় ও ৩৬তম নিলামে চায়ের দর উঠেছিল ১৮৮ টাকা। উৎপাদিত চা নিলামে বিক্রি করে পোষাতে পারছেন না মালিকরা। এতে তাদের প্রতিবছর লোকসান গুনতে হচ্ছে।
জানা গেছে, টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টিটিএবি) উদ্যোগে চট্টগ্রাম ও শ্রীমঙ্গলে সপ্তাহের প্রতি সোমবার চায়ের নিলাম হয়েছে থাকে। চলতি বছর চায়ের সর্বনিম্ন নিলাম মূল্য ১৬০ টাকা নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ টি বোর্ড (বিটিবি)। আন্তর্জাতিক চা নিলাম কেন্দ্র চট্টগ্রামে প্রতিবছর ৪৭ থেকে ৪৮টি নিলাম অনুষ্ঠিত হয়।
নিলাম সূত্র জানিয়েছে, গত সোমবার ৩৮তম নিলামে মোট ৩৮ লাখ ১৫ হাজার ২০৪ কেজি চা নিলাম হয়। আগের বছর ৩৮তম নিলামে চা বিক্রি হয়েছিল ৪১ লাখ ৮৭ হাজার ৭৫৭ কেজি। এর আগে চলতি বছরের ৩৭তম নিলামে ৩৯ লাখ ৮৬ হাজার ৯৬০ কেজি চা নিলাম হয়। আর আগের বছরের ৩৭তম নিলামে বিক্রি হয়েছিল ৪০ লাখ সাড়ে ৪২ হাজার কেজি।
বাগান মালিকরা বলছেন, মৌসুমের শেষ দিকে উত্তরাঞ্চলের সমতলের চায়ের সরবরাহ বেশি থাকে। এসব চায়ের দাম তুলনামূলক কম থাকায় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো কিনে নিয়ে পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে। আবার কিছু নন-ব্র্যান্ড ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান চা ব্লেন্ডিংয়ের প্রয়োজনে মৌসুমের শেষ দিকে চা সংগ্রহ করে। এ বছর নিলামের শেষ দিকে চায়ের দাম কমে যাওয়ায় বছরব্যাপী সার্বিক চায়ের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন তারা।
চায়ের দাম কমে যাওয়ার বিষয়ে নিলামকারী প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ব্রোকার্সের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহাজান বলেন, ‘চা বিক্রি করে বাগানিরা পোষাতে পারছেন না, এটা ঠিক। কিন্তু এখানে কারও হাত নেই। ওপেন নিলামের মাধ্যমে ভালো মানের চা বেশি দামে বিক্রি হয়। নিলামের শেষ দিকে চায়ের দাম কমে যায়। শেষ দিকে নিলাম থেকে অপেক্ষাকৃত কম মানসম্পন্ন চায়ের সরবরাহ বেশি হয়। এ কারণে চায়ের দামও কম।’
নেপচুন চা-বাগানের ব্যবস্থাপক কাজী এরফান উল্ল্যাহ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা যে চা উৎপাদন করি সেখানে প্রতি কেজি চা-তে ২১৫ থেকে ২২০ টাকা খরচ হয়। কিন্তু নিলামে বিক্রি করে কানায় কানায় মূল্য পাওয়া যাচ্ছে। দাম আরও বেশি পাওয়া গেলে বাগানের জন্য ভালো হতো।’
চা-বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও চট্টগ্রাম হালদাভ্যালী চা-বাগানের মালিক নাদের খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘চা-বাগানে গত বছর ৮ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছি। এ বছরও লোকসান হবে। চা উৎপাদন করে আমরা ন্যায্য দাম পাচ্ছি না। চা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘ছোট চাষিদের কারণে গুণগত মানসম্পন্ন চা উৎপাদন করা বাগানের মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কারণ ছোট চাষিরা নিম্নমানের চা উৎপাদন করে কম দামে বিক্রি করেন। এ ছাড়া ওই চা-পাতা মানসম্পন্ন পাতার সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করা হয়। এতে সাধারণ ক্রেতারা চায়ের স্বাদ পান না। অথচ নিম্নমানের চা উৎপাদনকারীরাও বাংলাদেশ টি-বোর্ডের নির্ধারিত সর্বনিম্ন মূল্য ১৬০ টাকা পাচ্ছেন। এতে তারা লাভবান হলেও বেশি খরচ করে মানসম্পন্ন পাতার উৎপাদনকারীরা প্রত্যাশিত মূল্য পাচ্ছেন না। প্রতি কেজিতে গড়ে ২১৩ টাকা খরচ হলেও বিক্রির সময় সেই টাকাই ওঠে না।’