চট্টগ্রামে ভোগ্যপণ্যের বড় বাজার খাতুনগঞ্জে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে এলাচ। রমজান ঘনিয়ে আসায় ব্যবসায়ীরাও পণ্যটির দামে কারসাজি করছেন। এক রাতেই পণ্যটির দাম বাড়িয়েছেন ৫০ টাকা। অপর দিকে আড়াই মাসের ব্যবধানে পণ্যটির কেজিতে নতুন করে বেড়েছে ৩৫০ টাকা।
সূত্র জানায়, বুকিং রেট ও ডলার রেট বাড়ার কারণে এবার এলাচের আমদানি কম হয়েছে। তবে এতে বাজার দরে প্রভাব পড়ার কোনো কারণ নেই।
গত বছর (জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর) ৩ হাজার টনের বেশি এলাচ আমদানি হয়েছে। এসব এলাচ ২৫০০ থকে ২৬০০ টাকায় কেনা। বুকিং রেট বাড়ার অজুহাতে আগের কেনা এলাচ দফায় দফায় দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে। খাতুনগঞ্জের বাদশা মার্কেট, ইলিয়াস মার্কেট, নবী মার্কেটসহ বিভিন্ন ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান মূল পণ্যের বিপরীতে স্লিপ-বাণিজ্য বাড়িয়ে দেওয়ায় পণ্যটির বাজার ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাতুনগঞ্জের এক ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, এক রাতে প্রতি কেজি এলাচে ৫০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। পণ্যটির দাম নতুন করে আর বাড়বে না, সেটা বলা মুশকিল। গত বছর কারসাজি করে ৪৫০০ টাকায় প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হয়েছে খাতুনগঞ্জে। এবারও সেই পথেই হাঁটছে অসাধু ব্যবসায়ীরা।
গত বছরের (২০২৪ সাল) নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে খাতুনগঞ্জে প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার ৮০০ টাকা। গত ২ ফেব্রুয়ারি পণ্যটির দাম বেড়ে কেজিপ্রতি ৪ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে রাত পোহাতেই যৌক্তিক কারণ ছাড়াই ৩ ফেব্রুয়ারি কেজিতে আরও ৫০ টাকা বাড়িয়ে ৪ হাজার ১৫০ টাকায় বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, বিশ্ববাজারে এলাচের বুকিং রেট বেড়েছে। আমদানিও কমেছে। তাই সরবরাহ কমায় পণ্যটির দাম বেড়েছে। অপর দিকে আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, চার মাসের ব্যবধানে প্রতি টন এলাচের বুকিং রেটে ৫০০ ডলার বেড়েছে। তাই পণ্যটির দামে প্রভাব পড়েছে।
রমজান মাসকে ঘিরে চার মাস আগে থেকে ভোগ্যপণ্য আমদানি শুরু করেন ব্যবসায়ীরা। জানা গেছে, গুয়েতেমালা, ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ বিশ্বের ১০ থেকে ১২টি দেশে এলাচ উৎপাদন হয়। তবে গুয়েতেমালা ও ভারতে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হওয়ায় এ দুটি দেশের ওপর বাজারমূল্য নির্ভর করে।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে খাতুনগঞ্জে এলাচের দরে কারসাজি শুরু হয়। ওই বছরের অক্টোবর পর্যন্ত পাইকারি বাজারটিতে প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হতো ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকা দরে। এরপর থেকে দফায় দফায় পণ্যটির দাম বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। গত বছরের (২০২৪ সাল) জুন মাসে দাম ঠেকেছিল ৪৪৫০ টাকায়। এরপর জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকারের দফায় দফায় অভিযানে গত বছরের আগস্টে দাম কমে প্রতিকেজি এলাচ বিক্রি হয় ২৭৫০ টাকায়। দুই মাস বাজার দর স্থিতিশীল থাকলেও অক্টোবরে দাম বেড়ে ৩১০০ টাকা ও নভেম্বরে ৩৮০০ টাকায় বিক্রি হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, রমজানকে কেন্দ্র করে বছরের ব্যবধানে এলাচের আমদানি ৩৭৯ টন কমেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের চার মাসে (অক্টোবর-জানুয়ারি) ৭৫৩ টন এলাচ আমদানি হয়েছে। অপর দিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছে ৩৭৪ টন এলাচ। এর মধ্যে গত বছরের অক্টোবরে ১৩০ টন, নভেম্বরে ১০০ টন, ডিসেম্বরে ৭০ টন ও চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৭৪ টন এলাচ আমদানি হয়েছে। এসব এলাচ ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস করে নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রামের মসলা পণ্য আমদানিকারক মো. ফারুক আহমদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘এলাচের বুকিং রেট গত বছরের তুলনায় বেড়েছে। গত বছরের অক্টোবরে প্রতি টন এলাচের বুকিং রেট ছিল ৩ হাজার ৫০০ ডলার। বর্তমানে ওই দর ঠেকেছে ৪ হাজার ডলারে। তাই পণ্যটির আমদানি কমিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।’
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার কল্যাণ সমিতি সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘বুকিং রেট ও ডলার রেট বাড়ার কারণে মূলত আমদানি খরচ বেড়ে গেছে। এ কারণে এলাচের দামটা বাড়তি। তবে রমজানকেন্দ্রিক অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ বেড়েছে। দামও নিম্নমুখী। আশা করছি, রমজান মাসে ভোগ্যপণ্যের দাম লাগামছাড়া হবে না।’
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘খাতুনগঞ্জে ডিও স্লিপ-বাণিজ্যের কারণে এলাচসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। ডিও স্লিপ-বাণিজ্য অবৈধ, এটা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি পাইকারি ব্যবসায়ীরাও নানা অজুহাতে এলাচসহ অন্যান্য পণ্য দাম বাড়িয়ে বিক্রি করে। আগামী মাস থেকে রমজান শুরু হবে। অথচ এখন থেকেই বাজার তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা উচিত ছিল। কিন্তু জেলা প্রশাসন, ভোক্তা অধিকারের এসব নিয়ে কোনো মাথাব্যথা দেখছি না। এ কারণে ভোগ্যপণ্যের দামে কারসাজি করার সুযোগ পাচ্ছে ব্যবসায়ীরা।’