জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধা থাকলেও রয়েছে নানামুখী সংকট। একটি তিনতলা ভবনে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালিত হলেও পাশেই নতুন চারতলা ভবন নির্মাণ করে হাসপাতালটিকে কাগজে-কলমে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। কিন্তু জনবল সংকট ও নতুন ভবনে রোগীদের যাতায়াতের জন্য ঢালু সিঁড়ি না থাকায় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাসংবলিত ভবনটি কোনো কাজেই আসছে না। চিকিৎসকসহ অন্যান্য সংকট ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সমস্যা সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার অবহিত করা হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না বলে জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী মেলান্দহ উপজেলা ও বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার তিন লক্ষাধিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির প্রধান ভরসা ১০০ শয্যাবিশিষ্ট মাদারগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তিনতলা বিশিষ্ট একটি ভবন থেকেই পরিচালিত হয় স্বাস্থ্যসেবা। বহির্বিভাগ, আন্তবিভাগ, অপারেশন থিয়েটারসহ প্রায় সবকিছুই রয়েছে এই ভবনে। তবে তিনতলা এ ভবনের পাশেই চারতলা আরেকটি ভবন নির্মাণ শেষে ২০২৩ সালের ১১ মার্চ এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেটিকে ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। কিন্তু জনবল বৃদ্ধি না করায় শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে এখনো শুরু করা সম্ভব হয়নি সেবা কার্যক্রম। তাই আগের মতো পুরোনো ভবনেই ৫০ শয্যার বিপরীতেই চলছে রোগী ভর্তি ও পরিচর্যা। হাসপাতালটিতে বর্তমানে কর্মকর্তাসহ ২০ চিকিৎসকের পদ সৃজন থাকলেও কর্মরত রয়েছেন মাত্র সাতজন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, আবাসিক মেডিকেল অফিসার ও পাঁচজন মেডিকেল অফিসার কর্মরত রয়েছেন। তবে তাদের মধ্যে চারজন মেডিকেল অফিসারই প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন কারণে ছুটিতে ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ে সংযুক্ত রয়েছেন। তাই বেশ কিছুদিন ধরে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ ও আন্তবিভাগে সেবা দিচ্ছেন মাত্র দুইজন চিকিৎসক। ৩১ নার্সের বিপরীতে ২৭ জন কর্মরত রয়েছেন, যা সন্তোষজনক হলেও তিনজন ওয়ার্ডবয়ের জায়গায় নেই একজনও।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, পুরোনো তিনতলা ভবনের নিচতলায় বহির্বিভাগে রোগী ও তাদের স্বজনরা টিকিট কেটে সেবা নিতে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়েছেন। এখান থেকে প্রতিদিন গড়ে তিন শতাধিক রোগী সেবা নিয়ে থাকেন। তবে পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় কর্মরত চিকিৎসকদের সেবা দিতে বেশ বেগ পেতে হয় এবং রোগীরাও সেবা নিয়ে সন্তুষ্ট নন।
বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসা ফুল মিয়া (৫০) বলেন, ‘ডাক্তার ওষুধ লিখে দেন, কিন্তু হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ দেয় না। এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম, ইসিজিসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাইরে থেকে করাতে হয়।’
ছয় দিন ধরে পুরুষ ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা মাদারগঞ্জ উপজেলার খিলকাটি গ্রামের সাহেব আলী (৬৫) জানান, শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, কিন্তু হাসপাতালের বাইরে থেকে এক্স-রে করতে হয়েছে। এখানে যে খাবার দেওয়া হয়, তা খাওয়া যায় না।
কর্তব্যরত সিনিয়র স্টাফ নার্স মেরিনা পারভীন জানান, হাসপাতালে নার্সের সংখ্যা স্বাভাবিক রয়েছে, কিন্তু ওয়ার্ডবয় না থাকায় সব সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। ইদানীং রোগী কম হলেও প্রায়ই রোগীর চাপ বেড়ে যায়, তখন হিমশিম খেতে হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আবু রায়হান বলেন, ‘চিকিৎসকসংকটের কারণে বেশ কিছুদিন ধরে আমি ও একজন মেডিকেল অফিসার সেবা দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের পক্ষে জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, আন্তবিভাগে সেবা দেওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। জনবল সংকটের কারণে নতুন চারতলা ভবনের কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না।