দীর্ঘ ১২ বছরেও নারায়ণগঞ্জের মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিল না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চসহ নাগরিক ব্যক্তিরা।
শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় শহিদ মিনারে আয়োজিত এক সমাবেশে বক্তারা অন্তর্বর্তীকালীন নির্দলীয় এই সরকারের কাছে হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।
সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ আয়োজিত এই সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক ও ত্বকীর পিতা রফিউর রাব্বি, সদস্য সচিব হালিম আজাদ, নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সভাপতি এবি সিদ্দিকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা।
সমাবেশ প্রধান অতিথি বক্তব্যে আনু মুহাম্মদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও ওই সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে আটকে থাকা হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার গত সাত মাসেও সম্পন্ন করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। এতে মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
ত্বকী হত্যার বিচার দ্রুত শুরু করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কারা ত্বকীকে হত্যা করেছে এইটা আপনারা সবাই জানেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজে কীভাবে এই হত্যাকারীদের রক্ষা করেছেন তাও জানেন। তার প্রশ্রয়ে এবং পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাফিয়াতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। র্যাব-পুলিশের মধ্যে খুনিদের পৃষ্ঠপোষক তৈরি করেছিলেন, ক্রসফায়ারের মতো ভয়ঙ্কর নারকীয় অবস্থা তৈরি করেছিলেন। তারই অংশ হিসেবে তিনি নারায়ণগঞ্জে ত্বকীর হত্যাকারীদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন, তাদের রক্ষা করেছিলেন। তার প্রত্যক্ষ ইঙ্গিতের কারণে ত্বকী হত্যার বিচার হয় নাই। শুধু ত্বকী নয়, গুম, খুনের অসংখ্য দৃষ্টান্ত এই বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে।’
ত্বকীর খুনিরা কীভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে এবং আনন্দে বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে এ প্রশ্নও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের কাছে রাখেন আনু মুহাম্মদ।
ত্বকীর পিতা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেন, ‘ত্বকী হত্যার বিচার হাসিনা করেনি। কারণ, তার মাফিয়ারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা ত্বকী হত্যা নিয়ে কথা বলেছিলেন, র্যাব কিছু কাজও করল। তারা ছয়জনকে গ্রেপ্তার করল একজনের জবানবন্দিও দিয়েছে। কিন্তু এরপর আর কিছু এগোয়নি।’
তিনি বলেন, ‘ত্বকী হত্যার এক বছরের মাথায় ২০১৪ সালে র্যাব সংবাদ সম্মেলন করে তদন্ত প্রায় শেষ করে ফেলার কথা জানায়। একটি খসড়া চার্জশিটও তারা তৈরি করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই চার্জশিট পূর্ণাঙ্গ করছে না তদন্তকারী সংস্থাটি।’
ত্বকী হত্যায় অভিযুক্ত আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও তার পরিবারের লোকজন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর আদালত তাদের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারির সমালোচনা করেন নিহত ত্বকীর পিতা।
সমাবেশ বক্তারা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা দায়িত্ব নেওয়ার পর সকলেই হত্যাকাণ্ডের বিচার করার কথা বলেও তারা এখনো পর্যন্ত তা রাখেননি। ত্বকী হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ রাজপথ ছেড়ে যাবেন না। অনতিবিলম্বে সকল হত্যাকারীদের নাম সংযুক্ত করে পূর্ণাঙ্গ অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়ার দাবি জানান বক্তারা।
সমাবেশে খেলাঘর আসরের সাবেক সভাপতি রথীন চক্রবর্তী, সিপিবির জেলা সভাপতি হাফিজুল ইসলাম, গণসংহতি আন্দোলনের জেলা সমন্বয়কারী তরিকুল সুজন, ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন, বাসদের সদস্য সচিব আবু নাঈম খানসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ৬ মার্চ শহরের শায়েস্তা খাঁ সড়কের বাসা থেকে বেরিয়ে সুধিজন পাঠাগারের সামনে থেকে অপহরণ হয় তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। দুইদিন পর শীতলক্ষ্যা নদীর শাখা কুমুদিনী খাল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে শামীম ওসমান ও তার ভাতিজা আজমেরী ওসামানের সম্পৃক্ত আছেন বলে অভিযোগ ত্বকীর পরিবারের। ত্বকী হত্যার বিচারের দাবিতে নারায়ণগঞ্জে গত ১২ বছর ধরে প্রতিমাসে আলোক প্রজ্বালন কর্মসূচিসহ নানাভাবে আন্দোলন করে আসছে বিভিন্ন সংগঠন।
বিল্লাল হোসাইন/মাহফুজ