সিলেটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কমিটি নিয়ে প্রতিনিয়ত বাড়ছে বিভেদ-বিভক্তি। মূলত আন্দোলনে সক্রিয় থাকা শিক্ষার্থীদের পদ বঞ্চিত করা, আন্দোলনে না থাকা ছাত্র এবং ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন এমন শিক্ষার্থীদের কমিটিতে রাখা নিয়ে এই অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই কমিটি নিয়ে অস্থিরতার চিত্র বেশিরভাগ সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেখা যায়। সোমবার (৩ মার্চ) কমিটি নিয়ে বিভেদের জেরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সহ-সমন্বয়ক ফয়সাল হোসাইনের ফেসবুক আইডি নষ্ট করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের এই বিভক্তির সূত্রপাত হয় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অফিসিয়াল পেজ থেকে সিলেট মহানগর আহ্বায়ক কমিটি প্রকাশ হওয়ার পর। ওই কমিটির আহ্বায়ক শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দেলোয়ার হোসাইনকে দেওয়া পদ ও আন্দোলনে সক্রিয় থাকা শিক্ষার্থীদের পদ বঞ্চিত করা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা করেন সহকারী সমন্বয়করা।
ওই সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সহ-সমন্বয়ক ফয়সাল হোসাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উক্ত কমিটির সমালোচনা করে বলেন, ‘ছাত্রলীগের এক ভাইয়া শাবিপ্রবিতে সীমান্তের গ্রুপ করতো, আন্দোলনে কোন নাশকতার জন্য দু’একদিন হয়তো উঁকি দিতে গিয়ে ফটোতে দেখা যাবে কি না জানি না! হয়তো যাবে। জুলাই তো দূরে থাকুক। আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবরেও আমরা তাকে চিনতাম না। কয়েকদিন আগে হঠাৎ বিপিএলের টিকেট বণ্টনে সিলেটে হাইলাইট হয়, সে নাকি আহ্বায়ক? যোগ্য লোকের এতোই অভাব? আরেকটা পোস্টে ফয়সাল হোসাইন লিখেন, এটা কি ছাত্রলীগের অসম্পূর্ণ কমিটি? বাংলাদেশের না হোক, সিলেটে আন্দোলনের ইতিহাস তো লিখতে পারি। এখনো কিছুই লিখিনি।’
কমিটি প্রকাশের পর সহ-সমন্বয়ক ফয়সাল হোসাইন বেশ কিছু প্রতিবাদী পোস্ট দেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে। কিন্তু সোমবার রাতে তার ওই ফেসবুক আইডি আর পাওয়া যাচ্ছে না। তাই ফয়সাল আশঙ্কা করছেন, কমিটি নিয়ে করা তার প্রতিবাদী পোস্টগুলো মুছে দিতেই তার আইডি নষ্ট করেছে বিরোধীরা।
ফয়সাল হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, আমি সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলি। তাই মহানগর কমিটি প্রকাশের পর ফেসবুকে লিখে প্রতিবাদ করেছি। কারণ ওই কমিটিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসাদুল্লাহ আল গালিবের ফ্যাসিবাদী চরিত্র পুরোদমে ফুটে ওঠেছে। তার কাছে বিগত আন্দোলন যারা করেছে, যারা আহত হয়েছে তাদের কোনো মূল্যায়ন নেই। তার তোষামোদি যারা করে, তাদেরই সে পদ দিয়েছে। আমার লিখা বন্ধ করতে না পেরে তারা এখন আমার ফেসবুক আইডির পিছনে লেগেছে।
এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সিলেট মহানগর আহ্বায়ক কমিটি প্রকাশের পরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সিলেটের সমন্বয়ক আসাদুল্লাহ আল গালিবকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে সংবাদ সম্মেলন করেন পাঁচটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাংশ। এসময় তারা সিলেট মহানগর আহ্বায়ক গঠিত কমিটি প্রত্যাখ্যান করেন। ওইসময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসাদুল্লাহ আল গালিবকে স্বৈরাচারী আখ্যা দিয়ে জানান, নবগঠিত আহ্বায়ক কমিটিতে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের নেওয়া হয়েছে। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ৯০% শিক্ষার্থী গালিবের ওপর তীব্র ক্ষিপ্ত, বিরক্ত। বৈষম্যবিরোধী সিলেট জেলার কমিটিতে ত্যাগীদের ছাটাই করে ও ন্যূনতম সদস্যপদ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। গালিবের সঙ্গে যারা লিয়াজু করে চলছে তাদেরই তিনি কমিটির পদ দিয়েছেন।
এই কমিটি নিয়ে বিভক্তি যখন চরম পর্যায়ে তখন গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মহানগর কমিটি স্থগিত ঘোষণা করেন সমন্বয়ক আসাদুল্লাহ আল গালিব। তিনি ফেসবুক পোস্টে লিখেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মহানগর কমিটিতে অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক ভুল থাকায় পেজ থেকে কমিটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সংশোধনের পর কমিটি প্রকাশ করা হবে।
এর আগে গত ৫ ডিসেম্বর সিলেট জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ২৭২ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। জেলা পর্যায়ে এটি ছিল সংগঠনের ১৬তম কমিটি। সংগঠনের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ ও সদস্য সচিব আরিফ সোহেল ছয় মাসের জন্য এ কমিটি অনুমোদন করেন। জেলার আহ্বায়ক কমিটিতে মদন মোহন কলেজের শিক্ষার্থী আকতার হোসেনকে আহ্বায়ক করা হয়। সদস্য সচিব করা হয় আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নুরুল ইসলামকে। কমিটিতে একটি বেসরকারি হাসপাতালের কর্মচারী ও একাধিক নিষ্ক্রিয় কর্মীকে রাখাসহ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত একাধিক ব্যক্তিকে রাখায় অভিযোগে অসন্তোষ দেখা দেয়। একদিনের মাথায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সিলেট জেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জুয়েল আহমদ পদত্যাগ করেন।
অপরদিকে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান রিয়াদের কক্ষে ঢুকে শিবিরের মারধরের প্রতিবাদে ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে নগরীতে বৈষম্যবিরোধী ব্যানারে মিছিল করেন কিছু শিক্ষার্থী। পরদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সিলেট জেলার মুখপাত্র মালেকা খাতুন সারা দাবি করেন, তাদের কোনো মিছিল বের হয়নি। সংগঠনের নাম ভাঙানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক দেলোয়ার হোসেন শিশির খবরের কাগজকে বলেন, কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা নতুন দলে চলে যাওয়ায় আপাতত সিলেট মহানগর কমিটি স্থগিত থাকবে। কেন্দ্রে নতুন নেতৃত্ব আসলে আমার কমিটি পূর্ণগঠন হবে। সংগঠন নিয়ে তেমন কোনো অস্থিরতা নেই। তবে বিগত আন্দোলন বা চলমান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কমিটি নিয়ে কিছু সম্মন্নয়হীনতা আছে। এর কারণ হচ্ছে আমরা সবাই কখনো সুসংগঠিত ছিলাম না। আমরা ছাত্ররা বিভিন্ন জন বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছি। তবে এই সমস্যা থাকবে না।
শাকিলা ববি/মাহফুজ