কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ। তাতে কেবল একজনের নাম ধরে অভিযোগ। লন্ডনে অবস্থানরত সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী এ অভিযোগ করেছেন। তার বলা কথা এমন, ‘বিএনপির একজন ভারপ্রাপ্ত মহানগরের কয়েস লোদী। তার প্রকাশ্য মদদে কিন্ত এটা ঘটেছে...!’
সিলেটে নিজের বাসা ও সাবেক সংসদ সদস্য শফিউল আলম চৌধুরীর বাসায় হামলার ঘটনায় তাৎক্ষণিক লন্ডনে সংবাদ সম্মেলন করেন সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। তাতে সিলেটের সহনশীল রাজনৈতিক অবস্থানের সংস্কৃতি ভেঙে পড়েছে অভিযোগ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে নিজের বক্তব্য পেশ করার পাশাপাশি তিনি সংবাদিকদের প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে উত্তরও দেন।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে যুক্তরাজ্য বিএনপি নেতা এম এ মালেকের দক্ষিণ সুরমার বাসায় ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান চৌধুরীর নগরীর ফাজিলচিস্ত এলাকার বাসায় হামলা হয়েছিল বলে সাংবাদিকদের জানালে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী তখন এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং আওয়ামী লীগ প্রতিবাদী ছিল বলে জানান। সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে কারা হামলা করেছে? সাংবাদিকদের এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি সেখানকার সাংবাদিকদের মাধ্যমেই খবর পেয়েছি। এ কথা বলে তিনি অভিযোগ করেন কয়েস লোদীর নাম ধরে।
লন্ডনে এই সংবাদ সম্মেলন বাংলাদেশ সময় মধ্যরাতে সরাসরি সম্প্রচার হয়। বিশেষ করে ফেসবুকে সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া আনোয়ারুজ্জামানের বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এরমধ্যে ‘বিএনপির একজন ভারপ্রাপ্ত মহানগরের কয়েস লোদী’ বলা ব্যক্তি হচ্ছেন সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। সিসিকের সাবেক প্যানেল মেয়র কয়েস লোদী সর্বশেষ আনোয়ারুজ্জামানের নির্বাচনকালীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ান। আনোয়ারুজ্জামানের সরাসরি অভিযোগের ভিডিওটি কয়েস লোদী তার ফেসবুকে দিয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৪ টায় কয়েস লোদী তার ফেসবুক আইডিতে ভিডিও ক্লিপটি আপ দেন। যুক্তরাজ্যের ‘রানার টিভি’র সম্প্রচারিত সংবাদ থেকে ভিডিও ক্লিপটি সংগৃহীত। এতে বার বার একই কথা-বিএনপির একজন ভারপ্রাপ্ত মহানগরের কয়েস লোদী! তার প্রকাশ্য মদদে কিন্ত এটা ঘটেছে।
ফেসবুকে দেখা গেছে, প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে ভিডিওটি দেখেছেন ৫২ হাজার। মন্তব্য ও শেয়ার করেছেন শতাধিক ব্যক্তি। মন্তব্যের কলামে কয়েস লোদীকে ‘সৎসাহসী’ বলে আখ্যায়িত করেছেন অনেকে। ভিডিওটি আপ দিয়ে কয়েস লোদী বরখাস্তকৃত সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর ভিত্তিহীন ও কান্ডজ্ঞানহীন অভিযোগ প্রসঙ্গে লিখেছেন, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল বিএনপি গণমানুষের আস্থা ও ভরসার এক অনন্য কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই দলটি বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ও চর্চা, রাজনৈতিক সম্প্রীতির লালন ও বিকাশের ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে। বিএনপি বিশ্বাস করে রাজনীতিকে মোকাবেলা করতে হয় রাজনীতি দিয়ে। গত ১৬ বছর আওয়ামী ফ্যাসিজম মোকাবেলা করতে বিএনপি রাজনৈতিক কাঠামো ব্যবহার করেছে, কখনো কোনো অপরাজনীতির আশ্রয় নেয়নি। বিগত সরকারের নানামুখি নির্যাতন, জেল-জুলুম, গুমের রাজনীতি সারাদেশের মতো সিলেটেও অব্যাহত ছিল। আমাদের সবার মনে থাকার কথা, রেজিষ্ট্রি মাঠে এস আই তারেক কীভাবে মাথা ফাটিয়েছিল প্রবীণ নেতা মরহুম এম এ হকের, কীভাবে কোমরে রশি বেঁধে টেনে নেওয়া হয়েছিল সাবেক এমপি মরহুম দিলদার হোসেন সেলিমকে। সেদিন আমার পিঠেও লাঠির প্রচন্ড আঘাত করেছিল আওয়ামী এসআই তারেক, এখনো আমার পিঠে সেই কালো দাগ আছে। জননেতা এম ইলিয়াস আলী, ইফতেখার আহমদ দিনার জুনেদ ও আনছারকে গুমের মাধ্যমে সিলেটের পরিচ্ছন্ন রাজনীতিতে কালিমা লেপন করে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার। এমসি কলেজের ছাত্রাবাস পুড়িয়ে দেওয়া, যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালেকের বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া ও গুলি ছোঁড়া, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরীর বাসা ভাঙচুর, বিএনপি নেতা বদরুজ্জামান সেলিমের পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান 'তারু মিয়া স্টোর' বারবার ভাঙচুর করেছিল স্বৈরশাসক আওয়ামী লীগ। সিলেট নগরীর ৭নং ওয়ার্ডে একাধিক বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর, সিলেটে ভিন্ন রাজনৈতিক দলের অসংখ্য নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর করে আওয়ামী লীগ নিজেদের ফ্যাসিবাদী চেহারা প্রকাশ করেছে বিগত ১৬ বছর। বিগত ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পর সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি যাতে না হয় সেজন্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে প্রতিটি পাড়া মহল্লায় বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা দলবেঁধে পাহারা দিয়েছে। আমরা লক্ষ করছি ইদানিং আবারো রাজনৈতিক রীতিনীতি তোয়াক্কা না করে নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ সিলেটের রাজনীতির মাঠকে উত্তপ্ত করার চেষ্টা করছে। মানুষ যখন ঘুমে থাকে তখন তাদের ৭/৮ জনের টিম মুখে কাপড় বেঁধে ২/৩ মিনিটের ঝটিকা মিছিল দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ফলাও করে প্রচার করছে। এই অশুভ তৎপরতার প্রতিবাদ জানিয়ে ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা জনসম্মুখে প্রকাশ্যে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিল করেছে। আমরা একই সঙ্গে সাধারণ ছাত্র জনতাকেও রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানাতে দেখেছি। পরবর্তী সময়ে কে বা কারা কয়েকটি বাসা বাড়িতে হামলা করে ভাঙচুর করেছে যা অন্য সবার মতো আমিও মিডিয়ায় দেখেছি। এসব ঘটনা অবশ্যই নিন্দনীয় এবং বিএনপি কোনোভাবেই এগুলো সমর্থন করে না। আমরা চিরাচরিতভাবে সৃজনশীল ও সৃষ্টিশীল রাজনীতিতে বিশ্বাসী, কোনো অপকর্ম আমরা সমর্থন করি না বা কোনো অপরাধীকে আশ্রয় বা শেল্টার দিই না। ইতোমধ্যে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে আমরা হয় তাদের বহিষ্কার করেছি কিংবা তদন্তের আওতায় এনেছি, এসব প্রমাণ সবাই দেখেছেন। আমি মিডিয়ায় দেখেছি, লন্ডনে বসে সিলেট সিটি করপোরেশনের বরখাস্তকৃত সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তিনি নাকি শুনেছেন ২ এপ্রিলের ঘটনায় সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সরাসরি মদদ দিয়েছেন। কোনোরুপ তথ্য প্রমাণ ছাড়া শুধুমাত্র শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে এরকম ভিত্তিহীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য আমাকে বিস্মিত করেছে। জনাব আনোয়ারুজ্জান চৌধুরী পদচ্যুত হওয়ার পর থেকেই এরকম লাগামহীন অন্তঃসারশূন্য বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। সিলেটের রাজনীতিতে নোংরা কালিমা লেপনের চূড়ান্ত আঁচড় দিয়ে সুযোগ বুঝে তিনি পালিয়ে গেছেন। মাত্র ৮ মাসের মেয়াদে তিনি সিটি করপোরেশনে দলীয় নেতা-কর্মীদের অবৈধ নিয়োগ, টেন্ডারবাজি করে শত কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন। মেয়র কার্যালয়কে অস্ত্রের স্টোররুমে পরিণত করেছিলেন, যার তদন্ত চলমান আছে; একসময় কর্তৃপক্ষ তা জাতির সামনে উপস্থাপন করবেন বলে বিশ্বাস করি।
জুলাই আন্দোলনে এই বরখাস্তকৃত সাবেক মেয়র তার অনুসারীদের হাতে বিপজ্জনক আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে ছাত্র জনতাকে দমনের চেষ্টা চালিয়েছেন, মিডিয়ার মাধ্যমে সেসব তথ্য জাতির সামনে উপস্থাপিত হয়েছে। নিজের এসব অপকর্ম আড়াল করতে বর্তমানে হেন কোনো নোংরা কাজ নেই যা তিনি করছেন না। মানুষের সহানুভূতি আদায় করতে বর্তমানে এসব নিষিদ্ধ মিছিল এবং হামলার ঘটনা তিনিই যে করাচ্ছেন না সে নিশ্চিয়তা কে দেবে? আমি প্রশাসনের কাছে জানতে চাই, জুলাই বিপ্লবের আগে বিএনপির নেতাকর্মীরা ধানক্ষেতে রাত্রি যাপন করেও যেখানে পার পায় নি, সেখানে অস্ত্রধারী এবং মামলার আসামিরা কী করে এখন শহরে অবাধে চলাফেরা করে? কীভাবে একটি নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন গভীর রাত হোক আর ভোর বিহানে হোক, রাস্তায় নেমে মিছিল করে? এ বিষয়ে আপনাদের আরও কার্যকর তৎপরতা দেখাতে হবে। নতুবা পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা স্থাপিত হবে না।
একই সঙ্গে বাসা বাড়িতে হামলার প্রকৃত মদদ দাতাকে শনাক্ত করুন এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। যেকোনো অপকর্ম প্রতিরোধ করতে গণমানুষের দল বিএনপি সবসময়ই আপনাদের পাশে থাকবে ইনশাআল্লাহ।'
নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ ফেসবুকে দিলেন কেন? বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জানতে চাইলে কয়েস লোদী খবরের কাগজকে বলেন, আমার বিরুদ্ধে উদ্ভট এই অভিযোগ পাবলিকলি প্রচার করে আমি নিজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে স্পষ্ট করেছি। আমি সিলেটের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একজন লালনকারী। অতীতে এমন অনেক কিছু হয়েছে, যা বর্ণনাতীত। সর্বশেষ জুলাই আন্দোলন চলাকালে আমাকে কারাবন্দী করা হয়। কার ইন্ধনে আমাকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তা স্পষ্ট। কিন্তু আমি প্রতিশোধ প্রণায়ন নই। যে কারণে আমার কারাভোগ ও নির্যাতন আমি মেনে নিয়েছি। নির্যাতন বলতে কী, আমাকে আটক করে সাড়ে তিনঘণ্টা প্রিজনভ্যানে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। গরমে আর বন্দীদের সঙ্গে গাদাগাদি করে অবস্থানের কারণে আমি অবচেতন হয়ে পড়েছিলাম। সেই সব নির্যাতন ভুলে যাওয়ার নয়। তবে যে অভিযোগ লন্ডনের আয়েশি জীবন থেকে তিনি করেছেন, তা অলীক। বাস্তবতা ভিন্ন। আমি এখন নই, সব সময়ই রাজনৈতিক কারণে বাসাবাড়িতে হামলার বিপক্ষে। আনোয়ারুজ্জাানের উদ্ভট অভিযোগের অসংলগ্ন কথা যাতে বিবেকবান মানুষ শুনেন, এ জন্য ভিডিওটি নিজ ফেসবুকে আপ দিয়েছি। তারা কতটা পাগলপারা, মানুষ দেখুক।’
উল্লেখ্য, বুধবার (২ এপ্রিল) সকালে সিলেট নগরীর ধোপাদিঘীর পাড়ে ঝটিকা মিছিল করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক এমপি শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল এবং সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর ছবি সংবলিত ব্যানার নিয়ে মিছিলে ২০/২৫ জন অংশ নেন। এই মিছিলের ভিডিও আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজেও আপলোড করা হয়। মিছিলের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুকে ভাইরাল হলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এ ঘটনায় মিছিলকারীদের আটজন আটক করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে ছাত্রলীগের মিছিলের প্রতিবাদে সিলেট নগরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল। এ দিন বিকেলে সিলেট সিটি করপোরেশনের অপসারিত সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর বাসায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে বিক্ষুব্ধ জনতা। এরপর সন্ধ্যায় নগরের হাউজিং এস্টেট এলাকায় শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলের বাসায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। একই সময়ে ৭নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আফতাব হোসেন খানের বাসায়ও হামলা চালানো হয়েছে। রাতে আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজের কানিসাইলের বাসায় ভাঙচুর করা হয়। এর আগে মিছিলকারীরা টিলাগড় গোপালটিলায় সাবেক এমপি রনজিত সরকারের বাসভবনে, মেজরটিলায় সিসিকের অপসারিত কাউন্সিলর রুহেল আহমেদের বাসায় ভাঙচুর চালানো হয়।
মাহফুজ/