বরগুনার শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার। ঐতিহ্যবাহী এই গ্রন্থাগারটি দীর্ঘ সময় ধরেই জেলার মানুষের জ্ঞান আহরণ ও শিক্ষা সম্প্রসারণে অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা এখানে বইপাঠের পাশাপাশি বিভিন্ন গবেষণামূলক কাজ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৮২ সালে জেলা শহরের কেন্দ্রস্থল জেলা পরিষদ রোডের থানা পাড়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় এই গণগ্রন্থাগার। শুরু থেকেই গ্রন্থাগারটি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে আসছে, যা আজও অব্যাহত। শুরুতে অল্প কিছু পুরোনো বই ও কিছু সংখ্যক পাঠক নিয়ে শুরু হলেও বর্তমানে এতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বই, পত্রিকা, সাময়িকী, জার্নাল এবং গবেষণামূলক প্রকাশনা। তবে জনবল ও পাঠকদের সুবিধার জন্য ক্যানটিনের সংকট রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, গ্রন্থগারে সুপরিসরে ও শান্ত পরিবেশে বইপড়ার নিরবচ্ছিন্ন জায়গা রয়েছে। পাঠকরা প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন বিভাগে বই খুঁজে নিতে পারছেন। সেখানে রয়েছে বিশেষ একটি রেফারেন্স কর্নার। শিশুদের জন্য রয়েছে পৃথক একটি শিশু কর্নার। সেখানে তারা নিজেদের বয়স উপযোগী বই পড়ার পাশাপাশি চিত্রাঙ্কনসহ বুদ্ধিবৃত্তিক বিভিন্ন খেলার সুযোগ পাচ্ছে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে মুক্তিযুদ্ধ কর্নার, চাকরিপ্রার্থীদের প্রস্তুতির জন্য জব কর্নারসহ নিয়মিত সদস্যদের জন্য রয়েছে ফ্রি ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা।
‘বরগুনা আত্মোন্নয়ন মঞ্চে’র শিক্ষা ও সাংস্কৃতিকবিষয়ক সম্পাদক সুবাহ্ তাবাসসুম ঐশী বলেন, ‘বরগুনা গণগ্রন্থাগারটি শুধু একটি গ্রন্থাগারই নয়, এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে উপকূলীয় মানুষের শিক্ষার প্রসার ঘটাচ্ছে। কিছু কিছু সংকট থাকলেও সেখানের পরিবেশ পাঠকদের জন্য সবসময়ই ভালো। তাই পাঠক হিসেবে, বিশেষ করে তরুণদের একবার হলেও এখানে আসা উচিত।’
গ্রন্থাগারের নিয়মিত পাঠক ও সাংস্কৃতিককর্মী আতিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের গণগ্রন্থাগারটি শুধু পড়াশোনার জায়গাই নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এ গ্রন্থাগারের পক্ষ থেকে প্রতিবছর নানা ধরনের সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষনীয় কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এর ফলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বিষয়ে স্থানীয়দের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হচ্ছে। তবে এখনে ক্যানটিন সুবিধা নেই। এটি চালু হলে দীর্ঘ সময় পাঠকরা থাকতে পারতেন।’
‘নিভৃত পাঠক সংঘ’ বরগুনার সভাপতি মারিয়া আক্তার মায়া বলেন, ‘গ্রন্থাগারটি আগের তুলনায় অনেক মনোরম হয়েছে। তবে পাঠকদের আরও আকর্ষণ করতে সেখানে বিভিন্ন প্রকৃতিক সৌন্দর্য বাড়ানো দরকার। কারণ পাঠক গ্রন্থাগারে বই পড়লেও যেন অনুভব করেন, তারা বই ও প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে আছেন। এ ছাড়া গ্রন্থাগারে বিখ্যাত চিত্রশিল্পীদের পেইন্টিং রাখা যেতে পারে। এতে শিশু-তরুণ সবাই নিয়মিত পাঠে আগ্রহী হবে।’
বেদে শিশুদের জন্য ‘আশার আলো পাঠশালা’র সভাপতি ইফরাত ইমা বলেন, ‘গ্রন্থাগারটিতে আরও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং পাঠক আকর্ষণের জন্য কাজ করতে হবে। পাশাপাশি এ নিয়ে জেলার সব স্কুল-কলেজে এবং অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদের কাছে প্রচার অভিযান চালানো উচিত। এতে বেদে শিশুদের মতো জেলার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য গ্রন্থাগারটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে শিশুতোষ গল্প, উপন্যাস, রম্যরচনার সংযোজনসহ শিশুদের জন্য আলাদা পাঠ-পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। এতে শুধু পিছিয়ে পড়া শিশুরাই নয়, সব শিশুর জন্যই এটি উপকার হবে।’
গণগ্রন্থাগারের লাইব্রেরিয়ান ও সহকারী পরিচালক মো. দেলুয়ার হোসেন বলেন, ‘জনবলসংকটের মধ্যেও আমরা সাধ্যমতো কাজ করে যাচ্ছি। পাঠকের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়ে ভালো লাগে। আমাদের এ প্রয়াস অব্যাহত থাকবে।’