চারপাশে পাহাড়-টিলার ঘন বন। এর মধ্যে বয়ে গেছে আঁকাবাঁকা নদী। একটি লম্বাকৃতির বক্স আদলের স্থাপনা যেন জল ও স্থলপথের মিলন ঘটিয়েছে। ওপর থেকে ঠিক এ রকম দেখা স্থাপনাটি। কবে স্থাপিত হয়েছিল? এ প্রশ্নেরও উত্তর রয়েছে স্থাপনাটির গায়ে। এক পাশে লোহা গলানো অক্ষরে লেখা সাল ও মাসের নাম। সেই সঙ্গে আছে সতর্কীকরণ, ‘লোড নট টু এক্সিড থ্রি টন-এপ্রিল ১৯২৫’। ৩ টনের বেশি ভার বইতে মানা!
বলা যায়, এই মান্যতায় শতবর্ষেও সচল রয়েছে স্থাপনাটি। এটি একটি ঝুলন্ত সেতু। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকায় সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়া চা-বাগানের নুনছড়ায় (পাহাড়ি নদী) এই সেতু। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এটিই অবিভক্ত বাংলার প্রথম ঝুলন্ত সেতু।
সেতুটি যতটা চা-বাগানের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, তার চেয়ে বেশি পর্যটকদের দর্শন তৃষ্ণা মেটাচ্ছে। ভারতের মেঘালয়ের ডাউকি ফল্টে (ভূমিকম্প চ্যুতি) বিচ্ছিন্ন পাহাড়ের সংযোগে ঝুলন্ত সেতু আর সিলেটের সীমান্ত প্রান্তিক এই সেতুকে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা এক দৃষ্টিতেই দেখছেন।
স্থানীয় ইতিহাস সূত্রে জানা গেছে, ব্রিটিশ আমলে একটি কোম্পানির অধীন লোভাছড়া চা-বাগান প্রতিষ্ঠা হয় ১৮৭৪ সালে। এরপর ব্রিটিশ কোম্পানির অধীন থাকাকালে ১৯২৫ সালের এপ্রিল মাসে ঝুলন্ত সেতুটি নির্মাণ করা হয়। চা-বাগানের তত্ত্বাবধানে তৎকালীন ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীতে ব্রিজটির লোহার কাঠামোর মধ্যে পাটাতন হিসেবে কাঠের ব্যবহার রয়েছে। ১৯৫০ সালে চা-বাগান ব্যবস্থাপনা বদল হয়। তখন থেকে বংশ পরম্পরায় চা-বাগানটির মালিক জেমস লিও ফারগুসন নানকা। বাগান পরিচালনার সঙ্গে ঝুলন্ত সেতুটি ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণে রাখা হয়।
২০২৫ সালের এপ্রিলে ঝুলন্ত সেতুর ১০০ বছর পূর্ণ হওয়ায় চা-বাগান মালিক পরিবারের পক্ষ থেকে ফেসবুকে একটি ‘ধন্যবাদ বার্তা’ দেওয়া হয়েছে।
ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের ঢলের তোড় বয়ে বেড়ায় পাহাড়ি নদী নুনছড়া। এ অবস্থায়ও টিকে রয়েছে সেতুটি। ১৪০ ফুট দৈর্ঘ্য, ৯ দশমিক ৫ ফুট প্রস্থের সেতুটির মূল কাঠামো অবিকল রয়েছে। সেতুটি শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সচল থাকায় চা বাগান পরিচালকের পক্ষে ইউসুফ ওসমান নাম না জানা নির্মাতাদের ধন্যবাদও জানিয়েছেন।
লোভাছড়া চা-বাগানে শতবর্ষী সেতুটি অবিভক্ত বাংলার প্রথম ঝুলন্ত সেতু বলে জানিয়েছেন ‘সিলেটের প্রত্নসম্পদ’ গ্রন্থের লেখক ও ‘সেভ দ্য হেরিটেজ অ্যান্ড এনভায়রনমেন’-এর প্রধান নির্বাহী আবদুল হাই আল হাদী।
তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘কোনো স্থাপনার স্থাপনকর্ম ১০০ বছর পূর্ণ হলেই এটি পুরাকীর্তি হিসেবে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর স্বীকৃতি লাভ করে। সেতুটির নামফলকই এর দালিলিক প্রমাণ। অবিভক্ত বাংলার ঝুলন্ত সেতুর ইতিহাসে এটি প্রথম হিসেবে তালিকাভুক্তি প্রয়োজন।’
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করা হবে জানিয়ে চা-বাগান কর্তৃপক্ষের পক্ষে ইউসুফ ওসমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘সেতুটির নির্মাণ তথ্য অনুযায়ী এপ্রিল মাস শেষ হলে শতবর্ষ পূর্ণ হবে। তখন তালিকাভুক্তির আবেদন করা হবে।’