বিল্লাল হোসেনের বয়স ৩৫ বছর। বাকপ্রতিবন্ধী ও মানসিক ভারসাম্যহীন অসুস্থ এই যুবকের এক পায়ে শিকল পরানো। মন চাইলেও তিনি কোথাও যেতে পারেন না। শিকলে সীমাবদ্ধ জায়গাতেই তার জীবন। ৯-১০ বছর বয়স থেকেই তাকে পরিবারের সদস্যরা শিকলবন্দি করে রাখেন। অর্থাভাবে তার চিকিৎসাও করানো হচ্ছে না। ফলে ২৫ বছর ধরে শিকলবন্দি অবস্থায় তাকে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।
রাজশাহী মহানগরীর তালাইমারি বাদুড়তলা এলাকার আবুল কালাম ও সাহেরা বেগম দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে বিল্লাল হোসেন চতুর্থ। বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন। বড় দুই ভাই আলমগীর ও জালমগীরের আয়ে কোনো মতে চলত সংসার। কিন্তু আলমগীর হঠাৎ স্ট্রোক করেন। এতে দিনমজুর জালমগীরের একার আয়ে ৯ জনের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বিল্লালের চিকিৎসার আশা শেষ পর্যন্ত মিলিয়ে যায়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বিল্লাল হোসেন অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিকভাবে জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠছিল। বিছানায় শুয়ে খেলা করত। তবে হাঁটা শেখে প্রায় তিন বছর বয়সে। কিন্তু কোনো কথা বলত না। তখন স্থানীয় কিছু চিকিৎসক ও কবিরাজের কাছে চিকিৎসা করানো হয়। যদিও অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় না। এভাবে ৮ থেকে ৯ বছর কেটে যায়। পরিবারের সদস্যরা চোখের আড়াল হলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে মহাসড়কের মাঝখান দিয়ে নানির বাড়িসহ বিভিন্ন জায়গায় চলে যেতেন বিল্লাল। এ সময় অকারণেই মানুষ তাকে বিরক্ত করা শুরু করে। তখন বিল্লাল এদিক-সেদিক চলে যেত। তখন তাকে খুঁজে বের করা ও দুর্ঘটনা এড়াতে বেসামাল হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। তাই বাধ্য হয়েই তার পায়ে শিকল পরানো হয়।
সরেজমিনে নগরীর তালাইমারি বাদুড়তলা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ছোট একটি ঘরে ছাগল বেঁধে রাখা হয়েছে। সেই ছাগলের পাশেই পায়ে শিকল পরিয়ে চেয়ারের সঙ্গে রাখা হয়েছে বিল্লালকে। প্রথম দেখায় মনে হয় তিনি চেয়ারে বসে চারদিক পরিদর্শন করছে। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখা যায় তিনি শিকলবন্দি। মানসিক ভারসাম্যহীন হলেও অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে বসে আছেন তিনি। তবে ক্ষুধা পেলে নিজের পেটে জোরে জোরে আঘাত করে ইঙ্গিত দিচ্ছেন। কোনো কিছু বলতে না পারলেও সবকিছুই শুনতে পান। তার সত্তরোর্ধ্ব মা সাহেরা বেগম ছেলের খাওয়া-গোসলসহ মল পরিষ্কার করে থাকেন।
বিল্লালের মা সাহেরা বেগম বলেন, দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই ছেলের পায়ে, কখনো হাতে শিকল পরিয়ে বেঁধে রাখি। এ দৃশ্য মা হয়ে সহ্য করতে পারি না। আমরা গরিব মানুষ। ঠিকমতো সংসার চালানোই সম্ভব হয় না। ছেলের উন্নত চিকিৎসা করব কীভাবে? তাই মানসিক হাসপাতাল বা বড় চিকিৎসকের কাছে নিতে পারিনি। দিনের পর দিন তার অবস্থা খারাপ হয়েছে।
বিল্লালের বড় ভাবি সেলিনা বেগম বলেন, ‘বিয়ে হয়ে আসার পর থেকেই বিল্লালকে বেঁধে রাখা দেখছি। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারি না। কোনো উপায় না পেয়ে তাকে এভাবে রাখতে বাধ্য হয়েছি।’ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে মানুষটি ঘরের এক কোণে শিকলবন্দি অবস্থায় পড়ে আছেন। খাবার, ওষুধ ও যত্নের অভাবে তার শারীরিক অবস্থাও দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে। কথা বলতে না পারলেও শিকলবন্দি থাকায় হাত-পা ব্যথা হয়ে গেলে ইঙ্গিত দেয়।
এ বিষয়ে মানবাধিকারকর্মী সুব্রত কুমার পাল বলেন, কোনো ব্যক্তিকে যে-ই বেঁধে রাখুক না কেন এটি এক ধরনের নিষ্ঠুরতা ও চূড়ান্ত মাত্রায় মানবাধিকার লঙ্ঘন। কেননা, বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য আইন ২০১৮ অনুযায়ী, মানসিক প্রতিবন্ধীদের উপযুক্ত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ফলে সমাজসেবা অধিদপ্তর প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসন ও চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সমাজসেবা অধিদপ্তর উপযাচক হয়ে এই ভূমিকা পালন করে না।
অথচ রাজশাহী মেডিকেলেও একটা সমাজসেবা বিভাগ আছে। তাদের দায়িত্ব হলো দরিদ্র, সুস্থ বা মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষের পুরো চিকিৎসার ব্যয় বহন করা। কিন্তু সমাজসেবা বিভাগ স্বপ্রণোদিতভাবে কোনো ভূমিকা রাখে না। পাশাপাশি নাগরিক হিসেবে সবার দায়িত্ব আছে, এমন অসহায় ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু আমরাও দাঁড়াচ্ছি না। ফলে সমাজসেবা বিভাগের পাশাপাশি নাগরিকদের যে দায় কোনোটাই পালন করা হচ্ছে না।