চট্টগ্রামের বিভিন্ন সড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অবৈধ যানবাহন। এর কোনোটির নেই রুট পারমিট, কোনো গাড়ির নেই ফিটনেস, আবার অনেক চালকের নেই ড্রাইভিং লাইসেন্স। এদিকে পুলিশের টোকেন নিয়ে চলছে অবৈধ থ্রি-হুইলার, লেগুনা ও ডাম্পার গাড়ি। তা ছাড়া নগরজুড়ে অলিগলিতে অপরিপক্ব হাতে চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। যে কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। তবে শহরে কী পরিমাণ অবৈধ যানবাহন রয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান কোনো সংস্থার কাছেই নেই।
চট্টগ্রাম মহানগরীর হামজারবাগ, বাকলিয়া, আরেফিন নগর, বহদ্দারহাট থেকে কালুরঘাট এবং নতুন ব্রিজ থেকে কোতোয়ালি মোড় এলাকায় অবৈধ যানবাহন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। গ্রামাঞ্চলের জন্য নিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশা শহরে প্রবেশনিষিদ্ধ হলেও অভিযোগ রয়েছে, পুলিশকে ম্যানেজ করে মাসোহারা দিয়েই শহরে চলাচল করে এসব যান। নগরজুড়ে শুধু সিএনজিচালিত অটোরিকশা নয়, রুট পারমিট ছাড়াই চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ও টমটম।
কক্সবাজার ও উত্তর চট্টগ্রাম থেকে নগরে প্রবেশের মুখ হলো বহদ্দারহাট মোড়। এটি যেন পারমিটবিহীন সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ও টমটমের জংশন। এসব গাড়ি রাখার জন্য নগরের বহদ্দারহাট মোড় থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত রয়েছে একাধিক স্ট্যান্ড।
এদিকে চান্দগাঁও থানাধীন খাজা রোডে দেখা গেছে, সরু এই সড়ক দিয়ে বলিরহাট পর্যন্ত প্রায় ৪০০ অটোরিকশা চলাচল করে। শহরে চলাচলের জন্য এসব গাড়ির অনুমতি নেই, আবার অধিকাংশ গাড়ির নেই নিবন্ধন নম্বর।
অন্যদিকে, বহদ্দারহাট মোড়ে মদিনা হোটেলের সামনে রয়েছে একটি টেম্পোস্ট্যান্ড। এখান থেকে নতুন ব্রিজ পর্যন্ত কয়েক শ টেম্পো চলাচল করে।
পাশাপাশি হক মার্কেটের সামনে আছে দুটি টেম্পোস্ট্যান্ড। এখান থেকে কালুরঘাট ও জেলার কাপ্তাই সড়কে চলাচল করে টেম্পো। ইচ্ছেমতো পার্কিং আর যাত্রী ওঠানামা করায় সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। তার পাশেই রয়েছে একটি মাইক্রোস্ট্যান্ড। এখান থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কে মাইক্রোবাস চলাচল করে।
একইভাবে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার আরেফিন নগরের সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের গলিতে গিয়ে দেখা যায়, শতাধিক অবৈধ সিএনজিচালিত অটোরিকশা দাঁড়িয়ে আছে; যার অধিকাংশের নেই নিবন্ধন। তাছাড়া নগরের মিয়াখান নগরে আছে একটি টমটম স্টেশন। নগরের চকবাজার ধুনিরপুল থেকে রাহাত্তারপুল পর্যন্ত চলাচল করে শতাধিক টমটম।
নগরের বহদ্দারহাট মোড় এলাকায় কথা হলে বেশ কিছু চালক জানান, বহদ্দারহাট মোড়ে পুলিশ বক্সের সামনেই সড়কের একপাশ দখল নিয়ে স্থাপন করা হয়েছে অটো টেম্পো (টুকটুকি) রাখার স্ট্যান্ড। কোতোয়ালি-আমতল পর্যন্ত এসব গাড়ি চলাচল করে। এ কারণে দৈনিক ১০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। বাবুল নামে এক ব্যক্তি প্রতিদিন পুলিশের নামে টাকা তোলেন।
তাছাড়া ট্রাফিক পুলিশকে ১ থেকে ৩ হাজার টাকা দিয়ে মাসিক টোকেন নিতে হয়। এসব টোকেনে ইংরেজিতে বিশেষ সাংকেতিক অক্ষর লেখা থাকে। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর তিন মাস বন্ধ থাকলেও বর্তমানে আবার চলছে রমরমা টোকেন বাণিজ্য। এ কারণে লেগুনা, থ্রি-হুইলার, টমটম, নছিমন, ব্যাটারিচালিত রিকশা-অটোরিকশাসহ তিন চাকার গাড়ি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সড়কে। এর মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চালাচ্ছেন লাইসেন্সবিহীন চালকরা। নগরের বিভিন্ন সড়কে ১৪ থেকে ১৫ বছর বয়সী কিশোররাও গাড়ি চালায়। হিউম্যান হলার, টেম্পো ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় কমবয়সী চালকের সংখ্যা বেশি।
চালকদের অপরিপক্বতা, ট্রাফিক আইন না মেনে উল্টোপথে গাড়ি চালানোর কারণে শহরজুড়ে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। এতে করে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। অনেক সময় রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সও যানজটের কবলে পড়ছে। রোগীর স্বজনদের পোহাতে হয় ভোগান্তি। তাছাড়া ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও চালকের অদক্ষতার কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। এতে করে অনেক পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি প্রাণ হারিয়ে বা পঙ্গুত্ব বরণ করে একটি পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থা (বিআরটিএ) চট্টগ্রামের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম শহর ও জেলায় চলাচলকারী মোট নিবন্ধিত বাস, মিনিবাস, ট্রাক, মিনিট্রাক, প্রাইভেট কার, সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৮৯।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) চট্টগ্রাম বিভাগীয় অফিসের উপপরিচালক সৈয়দ আইনুল হুদা চৌধুরী বলেন, ‘অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে আমাদের নিয়মিত অভিযান চলছে। আমরা প্রতি সপ্তাহে শহরে ও জেলায় অভিযান পরিচালনা করছি। ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অবৈধ রুট পারমিটবিহীন যানবাহনগুলোকে আমরা মামলা দিয়ে জরিমানা আদায় করছি। এ ছাড়া আমাদের অভিযানে ম্যাজিস্ট্রেটরা গাড়ি ডাম্পিং করে দিচ্ছেন। তিনি জানান, গত তিন মাসে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ১ হাজার ২৮২টি মামলায় ৪০ লাখ ৬১ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। শহরে কী পরিমাণ অবৈধ যানবাহন রয়েছে তারও কোনো পরিসংখ্যান নেই বিআরটিএর কাছে।
এ বিষয়ে নগর পুলিশের ট্রাফিক (উত্তর) বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) নেছার উদ্দিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান করছি। আমাদের ২০ জনের ফোর্স সবসময় কাজ করছে। এ ছাড়া দুই শিফটে আমাদের ৩৫ জন সার্জেন্ট, আটজন টিআই, ১০ জন প্রভেশনাল সার্জেন্টসহ ৪৬ জন কাজ করছেন। আমরা অবৈধ যানবাহনকে মামলা দিচ্ছি। গত এক মাসে উত্তর বিভাগে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৫৭০টি। আমরা মাঝে মাঝে সড়কে ও চার্জিং স্টেশনে সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে অভিযান চালাই। এতে অনেক অবৈধ যানবাহন ডাম্পিং করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সাড়ে তিন হাজার ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা জব্দ করা হয়েছে।’