সিলেট নগরীতে মঙ্গলবার (২০ মে) সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। সেটি কখনো ভারী, কখনো মাঝারি আকারের। টানা এই বৃষ্টিতে সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। এদিকে ভারতের মেঘালয় ও আসামে টানা ভারী বর্ষণ এবং শেরপুর জেলাজুড়ে কয়েক দিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের কারণে জেলার সব কটি নদ-নদীর পানি বাড়ছে।
সিলেট আবহাওয়া অফিস গতকাল ভোর ৬ টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত ১৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। সিলেটে গত সোমবারও ব্যাপক বৃষ্টি হয় । আবহাওয়া অফিসের হিসাব অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১৬৯ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় ১০১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয় এবং পরবর্তী ৩ ঘণ্টায় আরও ৬৮ মিলিমিটার।
এমন ভারী বৃষ্টিতে নগরীর বেশ কয়েকটি সড়ক ও আবাসিক এলাকায় পানি জমে যায়। বিশেষ করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের ভেতরে, কাজলশাহ, বাগবাড়ি, ভার্তখলা, নতুন বাজার, রেলস্টেশনের সড়ক, লাওয়াই, মেজরটিলা, বালুচরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় সড়কে এবং বাসাবাড়িতে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
ভার্তখলা এলাকার বাসিন্দা জামাল মিয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘সকালে বৃষ্টি শুরু হয়। এরপর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ঘরের ভেতর পানি ঢুকে পড়ে। প্রতিবছরই বৃষ্টির সময় একই সমস্যা হয়। প্রতিবছরই বলা হয় সব ঠিক করা হবে। কিন্তু কিছুই ঠিক করা হয় না।’
উল্লেখ্য, সিলেট নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল-নালা সংস্কারসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ইতোমধ্যে কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে সিলেট সিটি করপোরেশন। তবে এই উন্নয়নের তেমন কোনো সুফল পাননি নগরীর বাসিন্দারা। টানা তিন-চার ঘণ্টা বৃষ্টি হলেই নগরীর বিভিন্ন এলাকা পানিতে ডুবে যায়। বাসাবাড়িতে পানি ওঠে। যার ফলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় সাধারণ মানুষকে।
এদিকে শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ীর চেল্লাখালী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১০৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যা সোমবার রাত ১০টার দিকে ছিল ৩৯ সেন্টিমিটারের ওপরে। এদিকে ভোগাই, সোমেশ্বরী, মহারশি নদী এবং পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে মাঠে এখনো প্রায় ২০ শতাংশ জমির ধান কাটা বাকি আছে।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ভোগাই নদীর পানি (নকুগাঁও পয়েন্ট) বিপৎসীমার ৩৭৯ সেন্টিমিটার নিচে, নালিতাবাড়ী পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৫৭ সেন্টিমিটার নিচে এবং পুরাতন ব্রহ্মপুত্র (জামালপুর পয়েন্টে) বিপৎসীমার ৬৮৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। জেলায় গতকাল ভোর থেকে থেমে থেমে কখনো ভারী কখনো হালকা বা মাঝারি বৃষ্টি হচ্ছে। জেলার শেরপুর পয়েন্টে ৬৭ মিলিমিটার, নালিতাবাড়ী পয়েন্টে ১২৫ ও নাকুগাঁও পয়েন্টে ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে দুপুরের পর থেকে শেরপুরের আকাশে রোদের দেখা মিলেছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সতর্কবার্তায় বলা হয়, জেলার নিম্নাঞ্চলগুলো সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে, যা জনজীবন ও কৃষি খাতে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। এরই মধ্যে জেলা কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের পাকা ধান দ্রুত কেটে উঁচু স্থানে সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মাইকিং শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাঠে এখনো প্রায় ২০ শতাংশ ধান কাটা বাকি আছে। তবে দ্রুতই তারা ধান কেটে ফেলবেন। চাষিরা তাদের ধান ডুবে যাওয়ার ভয়ে আছেন। কিন্তু শ্রমিকসংকটে ধান কাটতে পারছেন না বলে অভিযোগ করছেন কিছু কৃষক।
ঝিনাইগাতী এলাকার কৃষক রহিম মিয়া বলেন, ‘আমি ২ একর জমিতে ধান লাগিয়েছি। দেড় একরের মতো কাটা হয়েছে। কিন্তু এখন পানি আসতেছে তাই কামলা পাইতেছি না। আমি নিজেই একটু একটু করে কাটতেছি।’
পাশেই থাকা আরেক কৃষক রোকন মিয়া বলেন, ‘আমি ধান একটু দেরিতে লাগিয়েছিলাম, তাই ধান পাকতেও দেরি হয়েছে। এখন সময় হয়েছে ধান কাটার, পানির অবস্থা দেখে তারপর কাটব। এখন তো আর শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। যে শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে তাও দাম চাচ্ছে বেশ চড়া।’
জেলা কৃষি বিভাগের উপপরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ইতোমধ্যে ৮৫ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। মূলত যেসব স্থানে পানি ওঠে সেসব এলাকার ধান কাটা হয়েছে। তবে কিছু কিছু জায়গায় এখনো ধান কাটা হয়নি। তাদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে দ্রুত ধান কাটার। এ ছাড়া কোনো কৃষক যদি কোনো ধরনের সমস্যায় পড়েন, তাহলে তাদের কৃষি বিভাগ থেকে সহযোগিতা করা হচ্ছে।
ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম রাসেল বলেন, বৃষ্টি ও উজানের কারণে পানি বেড়েছে। কিন্তু এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রশাসনের সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রস্তুতিমূলক সভা করা হয়েছে। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ে শুকনো খাবার ও টিন বরাদ্দ চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।