মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার ছোট একটি গ্রাম শোলধারা। এই গ্রামের পরিচিতি এখন ‘বাঙ্গির গ্রাম’ নামে। গ্রীষ্মকালীন এই মিষ্টি, রসালো ও সুস্বাদু ফলটির সুবাসে এখন পুরো গ্রাম মুখরিত। আর এই সুবাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে কৃষকের ভাগ্য। বাড়ছে মৌসুমি কর্মসংস্থান, জেগে উঠছে এক নতুন সম্ভাবনা।
প্রতিবছর গ্রীষ্ম এলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাঙ্গির চাষ হলেও শোলধারা যেন হয়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। এখানকার বাঙ্গি শুধু সুস্বাদুই নয়, আকারে বড় ও বাহ্যিক সৌন্দর্যেও অনন্য। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন জেলায় এর চাহিদা ও খ্যাতি রয়েছে।
চলতি বছর শোলধারা গ্রামের দুই শতাধিক কৃষক-কৃষাণী বাঙ্গির চাষ করছেন। কারও আবাদ এক বিঘায়, কারও পাঁচ বিঘা পর্যন্ত। একেকজন কৃষক তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা আর অর্জনের গল্প বলছেন। প্রতিটি গল্পে মিশে আছে কঠোর পরিশ্রমের সুখস্মৃতি ও অর্জনের অভিজ্ঞতা।
সরেজমিন দেখা যায়, যতদূর চোখ যায় কেবল বাঙ্গির খেত। কখনো পতিত জমি, কখনো উঠানঘেরা খণ্ড জমি- সবখানেই বাঙ্গির আবাদ। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে বাঙ্গির ঘ্রাণ। মাঠজুড়ে ঝাঁকা হাতে কৃষক-কৃষাণীরা ব্যস্ত বাঙ্গি সংগ্রহে। কেউ জমির পাশেই বসে পাইকারদের সঙ্গে দরদাম করছেন, আবার কেউ বিক্রির উদ্দেশ্যে ঝাঁকা নিয়ে হাটে ছুটছেন।
এই মৌসুমে শোলধারা-বানিয়াজুড়ী সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে একটি অস্থায়ী বাঙ্গির হাট। বানিয়াজুড়ী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে এই হাট বসে। এখানে শুধুই বাঙ্গির কেনাবেচা হয়। আকারভেদে প্রতিটি বাঙ্গি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩০০ টাকায়। পাইকাররা খেত থেকেই
বাঙ্গি কিনে রাজধানীর বাজারে সরবরাহ করছেন।
চার বিঘা জমিতে বাঙ্গির আবাদ করেছেন কৃষক বাবুল মিয়া। সব মিলিয়ে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা। এখন খেত থেকেই সব বাঙ্গি বিক্রি করেছেন ১ লাখ ২০ হাজার টাকায়। তিনি বলেন, ‘যা আশা করেছিলাম, তার চেয়ে অনেক ভালো পেয়েছি।’
বর্গাচাষি ইয়াকুব আলী বলেন, ‘এক বিঘা জমি ৩০ হাজার টাকায় লিজ নিয়ে পেঁয়াজ ও বাঙ্গির আবাদ করেছি। পেঁয়াজ চাষে মোট খরচ ৭০ হাজার টাকার মতো। সাথি ফসল হিসেবে বাঙ্গি বিক্রি করেছি ১৮ হাজার টাকার। লাভ কিছু হলেও হয়েছে।’
কৃষাণী সামেলা আক্তার বলেন, ‘এ বছর আমাদের বাঙ্গির ফলন খুব ভালো হয়েছে। একেকটির ওজন হচ্ছে তিন থেকে পাঁচ কেজি পর্যন্ত। শুরুতে প্রতি পিস বাঙ্গি ২০০-৩০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন দাম একটু কমেছে। তবু এখন পর্যন্ত আমরা ২৫ হাজার টাকার মতো বিক্রি করেছি। খেতে আরও আছে, আশা করছি ২০ হাজার টাকার মতো বিক্রি করা যাবে।’
কৃষক বাতেন মুন্সি বলেন, ‘আমি তিন বিঘা জমিতে বাঙ্গির আবাদ করেছি। ইতোমধ্যে লাখ টাকার মতো বিক্রি হয়েছে। আরও বাঙ্গি আছে, যা থেকে ৬০-৭০ হাজার টাকা পাওয়া যেতে পারে। আমাদের এলাকার কৃষকরা এখন বাঙ্গির দিকে ঝুঁকছেন।’
পাইকারি বিক্রেতা শফিকুল আলম বলেন, ‘প্রতিদিন ভোরে শোলধারা গ্রামে গিয়ে কৃষকের কাছ থেকে বাঙ্গি কিনি। প্রতিটি ঝাঁকার দাম ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। গড়ে প্রতিটি বাঙ্গির দাম ৫০ টাকার ওপরে পড়ে। এগুলো মানিকগঞ্জ শহরে এনে ৬০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি করি।’
বানিয়াজুড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস আর আনসারী বিল্টু বলেন, ‘বাঙ্গি চাষ প্রায় ২০০ পরিবারের জীবিকার প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছে। এই ফল ঘিরেই বানিয়াজুড়ী বাসস্ট্যান্ডে মৌসুমজুড়ে বাঙ্গির হাট বসে। এখানকার বাঙ্গির সুনাম রাজধানীতেও ছড়িয়েছে।’
ঘিওর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তহমিনা খাতুন বলেন, ‘এই অঞ্চলের বাঙ্গি খুবই মিষ্টি ও রসালো। চলতি মৌসুমে প্রায় চার হেক্টর জমিতে বাঙ্গির আবাদ হয়েছে। ফলন ভালো হয়েছে। কৃষকদের আমরা উন্নত জাত, পরামর্শ এবং কারিগরি সহায়তা দিয়ে পাশে থাকার চেষ্টা করছি।’