সময়টা ২০০২ সাল। মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বরাইদ ইউনিয়নের বরাইদ গ্রামে ১.৬৫ একর জমির ওপর গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য একটি আশ্রয়ণ প্রকল্প চালু করা হয়। তৎকালীন বিএনপি সরকারের স্থানীয় সংসদ সদস্য হারুণার রশীদ খান মুন্নুর উদ্যোগে তৈরি হয় ‘মুন্নু আবাসন’। প্রকল্পটিতে ছিল পরিকল্পিত ও দৃষ্টিনন্দন ঘরবাড়ির সারি। ছিল ছোট ছোট টিনের কক্ষ, টিউবওয়েল, শৌচাগার, গোসলখানা ও কমিউনিটি সেন্টার।
কিন্তু দুই দশক পেরিয়ে এখন সেই স্বপ্নের আবাসন যেন পরিণত হয়েছে বিষাদের প্রতীকে। ঘরের চালার টিন ঝরে পড়ে গেছে। কাঠামোগুলোও নড়বড়ে। শৌচাগারগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী। আর বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। যে আশায় ভূমিহীন পরিবারগুলো এখানে আশ্রয় নিয়েছিল, সেই আশ্রয়কেন্দ্র এখন তাদের জন্যই প্রাণহানির আশঙ্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, গত সরকারের আমলে আশ্রয়ণ প্রকল্প বাবদ সারা দেশে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হলেও এই আশ্রয়ণটি কেন অবহেলায় পড়ে ছিল? অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকল্পটি স্থানীয় বিএনপির সংসদ সদস্য হারুণার রশীদ খান মুন্নুর নামে হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকার আমলে এটির রক্ষণাবেক্ষণে কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। শুধু নামের কারণে এটি রাজনৈতিক আক্রশের শিকার হয়।
জানা গেছে, এখানকার বাসিন্দাদের বেশির ভাগই দিনমজুর। কোনো রকমে চাল-ডাল জোগাড় করে চলতে হয় তাদের। তার ওপর নিজেদের টাকায় মেরামত করে বসবাসের চেষ্টা করে যাচ্ছেন তারা। তিনটি টিউবওয়েলের ওপর নির্ভর করছে পুরো ১৮টি পরিবার। অনেক সময় টিউবওয়েল নষ্ট হলে নিজেদের টাকা জোগাড় করে মেরামত করাতে হয়।
মুন্নু আবাসনের একজন বাসিন্দা রুবি আক্তার। তিনি বলেন, ‘ঘর দুয়ার (দরজা) ভেঙে গেছে। ছেলেপেলে নিয়ে থাকতে সমস্যা হয়। পলিথিন টানিয়ে থাকি। বৃষ্টি হলেই পানি পড়ে।’ আরেক বাসিন্দা লতিফা আক্তার বলেন, ‘শুধু বৃষ্টির দিনে নয়, শীতকালে ভাঙা জায়গা দিয়ে কুয়াশা ঢোকে। টিনের নিচে পলিথিন দিয়ে কোনোমতে থাকি।’
বসবাসরত পরিবারগুলোর শিশুদের নিরাপত্তা নেই। শিশুরা রয়েছে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। প্রবীণদের অবস্থা আরও শোচনীয়। যেখানে এক সময় ৭০টি পরিবার বসবাস করত, সেখানে বর্তমানে আছে মাত্র ১৮টি পরিবার। আশ্রয়ণের করুণ অবস্থার কারণে বাকিরা বাধ্য হয়ে ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
মুন্নু আবাসনের সভাপতি বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘এক যুগের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সময়ে আমরা উপজেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি। তারা এসে দেখে গেছেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু কিছুই হয়নি। ঘরের চালা চুইয়ে পানি পড়ে। রাত হলে তারার আলো দেখা যায়। আমরা টিকে আছি শুধু পলিথিন দিয়ে।’
মুন্নু আবাসনের উন্নয়ন থেমে থাকার পেছনে রাজনৈতিক অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা। ফ্রান্স শাখা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও মানিকগঞ্জ যুবদল নেতা ফজলুল করিম শামীম বলেন, ‘আমাদের এলাকায় ২০০২ সালে গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য পরিকল্পিত ও দৃষ্টিনন্দন আবাসন প্রকল্প নির্মাণ করা হয়েছিল। শুধু বিএনপির সংসদ সদস্য হারুণার রশীদ খান মুন্নুর নাম থাকার কারণে গত দেড় যুগের বেশি সময় ধরে এই প্রকল্পে কোনো বরাদ্দ কিংবা প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ হয়নি। এটিই প্রমাণ করে আওয়ামী লীগ সরকারের কতটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কাজ করেছে।’
সাটুরিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কুদ্দুছ খান মজলিশ মাখন বলেন, ‘জাতীয় বাজেটে প্রতিবছর আশ্রয়ণ প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। শুধু ‘নাম’ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধের শিকার হয়ে দীর্ঘসময় ধরে এখানে কোনো সংস্কার কাজ হয়নি। আমরা চাই এখানে অতি দ্রুত সরকারি সাহায্য, নতুন নকশায় মেরামত অথবা পুনর্নির্মাণ করে বাসিন্দাদের বসবাসের সুযোগ করে দেওয়া হোক।’
বরাইদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গাজী মো. আব্দুল হাই স্বীকার করে বলেন, ‘ঘরগুলো জরাজীর্ণ। এগুলো মেরামত খুবই জরুরি।’
সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইকবাল হোসেন বলেন, ‘মুন্নু আবাসন একটি পুরোনো আশ্রয়ণ প্রকল্প। দীর্ঘদিন ধরে ঘরগুলো মেরামত না করায় বর্তমানে সেগুলোর অবস্থা বেশ জরাজীর্ণ। আমি দেড় মাস আগে নিজে ওই প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছি। সেখানকার নাজুক পরিস্থিতি দেখে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছি সমস্যাগুলোর একটি তালিকা তৈরি করে দ্রুত আমার দপ্তরে জমা দিতে। সেই তালিকার ভিত্তিতে মেরামতের জন্য উদ্যোগ নেব।’