‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে জীবিত মো. সেলিমকে (৪৮) ‘শহিদ’ দেখিয়ে মামলা করেছেন তারই বড় ভাই মোস্তফা কামাল (৫২)। গত বছরের ৩০ আগস্ট যাত্রাবাড়ী থানায় সেই মামলায় শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদেরসহ ৪১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় ১৫০-২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। সম্প্রতি এ ঘটনায় জানাজানি হওয়ায় ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়াজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
সেলিম ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার কুশমাইল ইউনিয়নের ধামর গ্রামের মৃত আব্দুল হাকিমের ছোট ছেলে। জাতীয় পরিচয়পত্রে তার নাম মো. সেলিম থাকলেও মামলায় তাকে দুলাল হোসেন ওরফে সেলিম দেখানো হয়েছে। তার বড় তিন ভাই হলেন-হেলাল উদ্দিন, আবুল হোসেন ও মামলার বাদী মোস্তফা কামাল।
গত বছরের ২৭ আগস্ট সেলিমকে নিজের ভাই উল্লেখ করে রাজধানীর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলার আবেদন করেন মোস্তফা কামাল। মামলার আরজিতে ৩ আগস্ট বিকেলে যাত্রাবাড়ী থানা এলাকার শনির আখড়ার কাজলা পেট্রলপাম্পের সামনে ছাত্র-জনতার মিছিলে মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে সেলিম মারা যান বলে উল্লেখ করা হয়। তার লাশ উদ্ধার করে রাজধানীর গোপীবাগ এলাকার রামকৃষ্ণ মিশনের (আর কে মিশন রোড) পাশের কবরস্থানে দাফন করা হয়। মামলায় শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে ৪১ জনের নাম উল্লেখ ও আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১৫০ থেকে ২০০ নেতা-কর্মীকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। মামলার বাদী মোস্তফা কামালের (৫৫) ঠিকানা হিসেবে আর কে মিশন রোড, বদী মেম্বারের বাড়ি, মুগদা, ঢাকা উল্লেখ করা হয়। একই বছরের ৩০ আগস্ট আদালতের আদেশে যাত্রাবাড়ী থানায় সেলিম হত্যা মামলা রেকর্ড হয়।
মামলার বাদী মোস্তফা কামাল ওরফে মস্তু যিনি তার ভাই মো. সেলিমকে ‘শহিদ’ দেখিয়ে মামলা করেছেন। ছবি: সংগৃহীত
স্থানীয় সূত্রে জানায়, মোস্তফাকে এলাকার মানুষ মস্তু ডাকাত হিসেবে চেনেন। ধামর গ্রামের গোলাপ মিয়া, নীল মামুদ ও রয়েল নামের ১০ বছর বয়সী শিশু হত্যায় তিনি জড়িত। এমন কোনো অপরাধ নেই, তিনি করতেন না। তার ভয়ে এলাকার মানুষ এখনো আতঙ্কিত। ২০০৫ ও ২০১২ সালে মোস্তফার বিরুদ্ধে থানায় দুটি হত্যা মামলা হয়। সর্বশেষ রয়েল হত্যার পর মোস্তফা এলাকা ছাড়েন। ঢাকায় বাস চালিয়ে জীবন চালাচ্ছিলেন।
আরও জানা যায়, প্রায় ২০ বছর আগে তাদের বাবা আব্দুল হাকিমের মৃত্যুর পর থেকেই ভাইদের মধ্যে জমি নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। সেলিমের শুধু দুই কন্যাসন্তান থাকায় তার ভাগের সম্পত্তিতে নজর পড়ে বাকি তিন ভাইয়ের। এদিকে দুটি হত্যাসহ চারটি মামলায় জড়িয়ে আর্থিকভাবে নিঃস্ব মোস্তফা কামাল পূর্বপরিকল্পিতভাবে সেলিমকে নিয়ে মিথ্যা মামলা করেন। মিথ্যা মামলার বিষয়টি জানাজানি হয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে মামলার বাদী মোস্তফা নিরুদ্দেশ হয়ে যান।
‘মৃত’ দেখিয়ে বড় ভাই মামলা করায় সেলিম এখন নিজেকে জীবিত প্রমাণ করতে থানা ও আদালতে দৌড়াচ্ছেন।
ভাইদের অত্যাচারে বছরখানেক আগে বাড়ি ছেড়ে ধামর বেলতলী বাজারে আড়াই শতক জমি কিনে ঘর করে বসবাস করছেন। সেখানে তার একটি দোকান আছে।
বক্তব্য জানতে চাইলে সেলিম বলেন, আমার ভাইয়েরা প্রায় ১৫০ শতক জমি দখল করে রেখেছেন। জমি নিয়েই ভাইদের সঙ্গে বিরোধ। এ নিয়ে আদালতে মামলাও চলছে। আমি বাড়িতে গেলে আমার ভাইয়েরা আমাকে মেরে ফেলার ভয় দেখান। এ জন্য ভয়ে বাড়িতে যাই না। আমি জীবিত সেটি প্রমাণ করতে দু’বার আদালতেসহ কয়েকবার পুলিশের কাছে গিয়েছি। আমি আমার ভাইদের বিচার চাই।
সেলিমের স্ত্রী হাজেরা খাতুন বলেন, গত ১৫ বছর ধরে মোস্তফা বাড়িতে আসে না। বাড়িতে না এলেও বাকি দুই ভাইকে দিয়ে আমার স্বামীর সম্পত্তি গ্রাস করতে মরিয়া হয়ে ওঠেছে। মূলত আমার স্বামীকে হত্যার উদ্দেশ্যেই তিন ভাই এই নাটক সাজিয়েছে।
স্থানীয় মোর্শেদ আলী বলেন, মোস্তফাকে এলাকার মানুষ মস্তু ডাকাত হিসেবে চেনেন। সে একাধিক মামলার আসামি। তাকে গ্রেপ্তার করা প্রয়োজন।
সেলিমের ভাই হেলাল উদ্দিনের মেয়ে ঝুমি আক্তার বলেন, প্রায় ১৫ বছর ধরে মস্তু কাকা বাড়িতে আসেন না। বর্তমানে তিনি রাজধানীতে বসবাস করেন। আমার বাবাকে কেন সাক্ষী করা হয়েছে তা আমাদের জানা নেই।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওয়ারী বিভাগের উপপরিদর্শক আমিনুল ইসলাম বলেন, মামলার বাদী মস্তুর বিরুদ্ধে অন্য মামলা থাকায় তিনি পলাতক। তার মোবাইল বন্ধ, কোথায় আছে, সেটাও জানা যাচ্ছে না। সেলিম মৃত নন, এটা নিশ্চিত করতে আদালতের মাধ্যমে দুই ভাইকে সামনা-সামনি করে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য আবেদন করা হয়েছে। আদালত অনুমতি দিলে সিআইডি ডিএনএ পরীক্ষা করবে।
এ বিষয়ে ফুলবাড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রুকনুজ্জামান বলেন, পারিবারিক বিরোধের কারণেই জীবিত সেলিমকে মৃত দেখিয়ে তার ভাই মামলা করেছেন। মস্তুর নামে দুটি হত্যা, একটি চাঁদাবাজি এবং একটি মারামারির মামলা রয়েছে।
কামরুজ্জামান মিন্টু/মাহফুজ