আজ শনিবার, দেশে ‘চা-শিল্পের উন্নতি, সবুজ হোক অর্থনীতি’ প্রতিপাদ্যে জাতীয় চা দিবস উদযাপিত হচ্ছে। তবে দেশের চা-শিল্প অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও চা-বাগানের শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান এখনো উদ্বেগজনক। দৈনিক মজুরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও শ্রম অধিকারের ক্ষেত্রে নানা বঞ্চনার শিকার চা-শ্রমিকরা। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়েও শ্রমিকদের জীবনমানের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
জানা গেছে, চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি অতীতে ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন চুক্তি ও বার্ষিক বৃদ্ধির ফলে কিছু বাগানে মজুরি কিছুটা বেড়েছে। তবে শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান বাজারদরে এই আয় দিয়ে পরিবারের খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় বহন করা অত্যন্ত কঠিন।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও চা-শ্রমিক পরিবারের সন্তানরা পিছিয়ে রয়েছে। অনেক বাগানে মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পর্যাপ্ত শিক্ষা সুবিধার অভাব রয়েছে। ফলে দারিদ্র্য ও শিক্ষাবঞ্চনার চক্র থেকে বেরিয়ে আসা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতাও প্রকট। অনেক বাগানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, ওষুধ ও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হয় না। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন সুবিধা এখনো অপর্যাপ্ত।
চট্টগ্রাম চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ও কর্ণফুলী চা-বাগানের শ্রমিক বাবু চিত্ত রঞ্জন মন্টু বলেন, ‘শ্রম আইন অনুযায়ী প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা সব ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয় না। আমাদের মজুরি পুনর্নির্ধারণ, ভাতা বৃদ্ধি, পেনশন সুবিধা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক বাগানে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ঠিকমতো দেওয়া হয় না। চা-শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছি।’
চট্টগ্রামের নেপচুন চা-বাগারের দেশসেরা শ্রমিক জেসমিন আক্তার খবরের কাগজকে বলেন, ‘কম মজুরি দিয়ে সংসার চলে না। স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা সুবিধার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মানসম্মত শিক্ষা ও আবাসনের অভাব এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশের ঘাটতি রয়েছে। শ্রমিকদের সংগঠিত হয়ে দাবি আদায়ে নানা বাধা, নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে বৈষম্য ও অতিরিক্ত ঝুঁকিতে কাজ করতে হচ্ছে। বিভিন্ন বাগানে শ্রমিকরা চা তুলতে না পারলে হাজিরাও দেওয়া হয় না। রোদ-বৃষ্টি মাড়িয়ে কাজ করতে হয় বাগানে।’
কর্ণফুলী চা-বাগানের শ্রমিক রিকু ত্রিপুরা জানান, শুধু মজুরি বৃদ্ধি নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, বিশুদ্ধ পানি ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করলেই তাদের জীবনমানের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।
রাঙ্গাপানি চা-বাগানের শ্রমিক মাধবী ত্রিপুরা বলেন, ‘আমাদের বাগানের অফিসের পাশে একটি মাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। বাগানের ভেতর থেকে আমাদের শিশুরা এই স্কুলে আসতে পারে না। বাগানের মালিকরা চান, শ্রমিকের ছেলেমেয়েরাও শ্রমিক হোক। আমরা চাই, আমাদের সন্তানরা লেখাপড়া করে মানুষ হোক।’
ইস্পাহানি গ্রুপের নেপচুন চা-বাগানের ব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) মো. রিয়াজ উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘দেশের অন্যতম প্রাচীন এই শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। তবে পরিস্থিতি সব জায়গায় এক নয়। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, মানবাধিকার সংস্থা ও সরকারের উদ্যোগে নানা সময়ে মজুরি বৃদ্ধি ও কল্যাণমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তারপরও বহু চা-শ্রমিক এখনো জীবনযাত্রার ব্যয় ও শ্রমের তুলনায় পর্যাপ্ত সুবিধা পান না।’
বাংলাদেশ টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘চা-বাগানের শ্রমিকরা অধিকার থেকে বঞ্চিত সেটি সঠিক নয়। তারা দৈনিক মজুরি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, রেশন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও শ্রম অধিকার অনুযায়ী বেতন-ভাতাদি পেয়ে থাকেন। বাগানের মালিক ও শ্রমিক ইউনিয়নের মধ্যে সম্পাদিত শ্রমচুক্তি অনুযায়ী প্রতিবছর শ্রমিকদের মজুরি ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ চা বোর্ডের পক্ষ থেকে বাগান মালিকদের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ রক্ষা করা হয়। পাশাপাশি শ্রমিকদের মজুরিসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যেন সময়মতো বৃদ্ধি করা হয়, সে জন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করার কাজ চলমান রয়েছে।
উল্লেখ্য, চা-শ্রমিকরা দৈনিক মজুরির পাশাপাশি টাস্ক অনুযায়ী অতিরিক্ত কাজ সম্পাদন করলে চুক্তি অনুসারে অতিরিক্ত টাকা পেয়ে থাকেন। পাশাপাশি সাপ্তাহিক রেশন এবং যারা রেশন গ্রহণ করেন না তারা চাষাবাদের জন্য ধানি জমি পেয়ে থাকেন।
এদিকে প্রতিবছর ২১ মে জাতীয় চা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত থাকলেও চলতি বছর ঈদুল আজহার কারণে মূল আনুষ্ঠানিকতা পিছিয়ে দিবসটির উদযাপন ২০ জুন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশ চা বোর্ড সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ২০ জুন জাতীয় চা দিবস পালন করা হচ্ছে।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেবেন বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ। বিশেষ অতিথি থাকবেন মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী। এ ছাড়া চা-শিল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজন ও চা-শ্রমিক প্রতিনিধিরা আলোচনা সভায় অংশ নেবেন।
বেলা ১১টায় বাণিজ্যমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হবে। উদ্বোধনী পর্বের পর চা-শিল্পবিষয়ক ডকুমেন্টারি প্রদর্শন ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভা শেষে দেশের চা-শিল্পে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আটটি ক্যাটাগরিতে ‘জাতীয় চা পুরস্কার-২০২৬’ প্রদান করা হবে। পাশাপাশি চলতি বছর প্রথমবারের মতো শ্রেষ্ঠ বটলিফ চা কারখানা ক্যাটাগরিতে বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হবে।
প্রধান অতিথি বিজয়ীদের হাতে ট্রফি ও সনদ তুলে দেবেন। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ চা বোর্ড ও দেশের শীর্ষস্থানীয় চা-প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণে একটি চা-প্রদর্শনীরও আয়োজন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে মোট ১৭২টি চা বাগান রয়েছে। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের সমতল ভূমিতেও চা চাষের সম্প্রসারণ ঘটেছে। দেশের চা-শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে চায়ের রাজধানীখ্যাত শ্রীমঙ্গলে এবার ষষ্ঠবারের মতো জাতীয় চা দিবস উদযাপন করা হচ্ছে।