‘তথ্য আপা: ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে মহিলাদের ক্ষমতায়ন’ প্রকল্পকে রাজস্ব খাতে নিয়ে নতুন করে প্রকল্প শুরু করার দাবিতে ২২ দিন ধরে প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান করছেন এ প্রকল্পের কর্মীরা। সেই সঙ্গে তাদের দাবি, প্রকল্পে কর্মরতদের চাকরি স্থায়ী করতে হবে এবং তাদের পাওনা বেতন দিতে হবে।
এ অবস্থায় এই প্রকল্পের কর্মীদের একটি প্রতিনিধিদল বৃহস্পতিবার (১৯ জুন) প্রকল্পসংশ্লিষ্ট মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হবে।
বুধার (১৮ জুন) দুপুরে প্রেসক্লাবের সামনে এ কর্মসূচির ২২তম দিনে দেখা যায়, গত ২৮ মে থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন প্রায় ১৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। অবস্থানকারীদের অনেকে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। কেউ কেউ সন্তানকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। প্রচণ্ড বৃষ্টি ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও তারা কখনো খোলা আকাশের নিচে, কখনোবা শামিয়ানা টাঙিয়ে দিন-রাত অবস্থান করছেন।
এতে অংশ নিয়ে কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার তথ্যসেবা কর্মকর্তা মুক্তা আক্তার খবরের কাগজকে বলেন, ‘২০২২ সাল থেকে তার স্বামী ক্যানসারে ভুগছেন। পরিবারের সিংহভাগ দায়িত্ব এখন আমার কাঁধে। তার মা-ও অসুস্থ, তার জন্য মাসে ৬ হাজার টাকার ওষুধের প্রয়োজন হয়। চাকরি না থাকলে এগুলো কীভাবে হবে?’
মুক্তার মতোই তথ্য আপা মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এই প্রকল্পে দেশজুড়ে কাজ করছেন প্রায় দুই হাজার তথ্য আপা। এখন এসব প্রকল্পকর্মীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের মেয়াদ এ মাসের ৩০ তারিখে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে চাকরি স্থায়ীকরণ বা প্রকল্পের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে না পেরে তারা মানববন্ধন থেকে প্রথমে ‘আমরণ অনশন’ এবং পরে অবস্থান কর্মসূচিতে গেছেন।
ঝালকাঠির তথ্যসেবা কর্মকর্তা সঙ্গীতা সরকার বর্তমানে এই অবস্থান কর্মসূচি পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের অধিকাংশ কর্মীই উচ্চশিক্ষিত। আমরা আমাদের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়টা এই প্রকল্পে ব্যয় করেছি। প্রকল্পে নিয়োগের সময় কর্মীদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল, প্রকল্প শেষে তাদের জন্য নতুন পদ সৃষ্টি করে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হবে। রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের সুবিধা নিশ্চিত করতে হলে নির্দিষ্ট হারে বেতন থেকে কিছু অর্থ কর্তন করা হবে। কর্মীরা সেই নিশ্চয়তার ওপর ভরসা করে নিয়মিতভাবে বেতন থেকে টাকা কাটতে দিয়েছেন। কিন্তু এখন প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের কোনো নিশ্চয়তা নেই এবং কর্তনকৃত অর্থ ফেরতের ব্যাপারেও কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এটা আমাদের মধ্যে তীব্র হতাশা সৃষ্টি করেছে। তা ছাড়া এসব প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করেই আমাদের অনেকে অন্য সুযোগ ত্যাগ করে এই প্রকল্পে যুক্ত আছেন। আমাদের দাবি- এই প্রকল্পকে রাজস্ব খাতে নিয়ে আমাদের চাকরি স্থায়ী করা হোক এবং আমাদের যে বেতন পাওনা আছে, তা দেওয়া হোক।’
অবস্থানকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১১ সালে পাইলট প্রকল্প হিসেবে ‘তথ্য আপা: ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে মহিলাদের ক্ষমতায়ন’ কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১৮ সালের শেষ দিকে দ্বিতীয় পর্যায়ে ৪৯২ উপজেলায় এটি বিস্তৃত হয়। পরে প্রকল্পটির নাম ও কাঠামোয় কিছু পরিবর্তন আসে। বর্তমানে প্রকল্পের পুরো নাম- ‘তথ্য আপা: তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে নারীদের ক্ষমতায়ন প্রকল্প (২য় পর্যায়) (২য় সংশোধিত)। প্রকল্পের মোট জনবল ২ হাজার ৪৮৪ জন হলেও বেতন-ভাতা অনিয়মিত হওয়ায় এখন কর্মরত ১ হাজার ৯৬৮ জন। তাদের মধ্যে অধিকাংশই উচ্চশিক্ষিত নারী। তারা একাধিক ধাপে পরীক্ষা দিয়ে এই পদে নিয়োগ পেয়েছেন। তৃতীয় পর্যায়ের নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় তাদের বাদ দিয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, এমন খবরে এখন চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তায় তাদের দিন কাটছে।
এ বিষয়ে জানতে জাতীয় মহিলা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রকল্পের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী নতুন প্রকল্প এলে জনবল পুনর্নিয়োগ হবে, সেখানে এই জনবলকেই রাখতে আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি। কিন্তু প্রকল্পে জনবল নিয়োগের নীতিমালা আছে। এর বাইরে গিয়ে কিছু করা সম্ভব নয়। আমরা তৃতীয় পর্যায়ে প্রকল্পটি নেওয়ার চেষ্টা করছি।’