দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে ফেনী পৌরশহরে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৪৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যা ফেনীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। এদিকে টানা বৃষ্টির কারণে জেলার সীমান্তবর্তী মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার ৭৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
অন্যদিকে মুহুরী নদীর পাড়ের একটি স্থান ও সিলোনিয়া নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধের একটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বাঁধ ভাঙনের কারণে লোকালয়ে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। এ নিয়ে স্থানীয়রা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। এদিকে কয়েকদিনের বৃষ্টিতে খুলনা ও বরিশাল নগরী এবং সাতক্ষীরার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এ নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন অনেকে। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
ফেনী: পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র ও স্থানীয়রা জানান, সোমবার বিকেল থেকে ফেনীতে ভারী বর্ষণ শুরু হয়। বৃষ্টির পানিতে তালিয়ে যায় ফেনী শহর। শহরের শহিদ শহীদুল্লা কায়সার সড়ক, রামপুর শাহীন অ্যাকাডেমি এলাকা, পাঠান বাড়ি এলাকা, নাজির রোড, পেট্রোবাংলাসহ বিভিন্ন এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে আছে। এর মধ্যে কোথাও কোথাও তিন থেকে চার ফুট পানি জমেছে। এর ফলে ওই সব এলাকার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এতে দুর্ভোগে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দা। এদিকে বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে গতকাল ফেনী শহরের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। স্থগিত করা হয় অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষা। অন্যদিকে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ফেনীর পরশুরাম উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের গদানগর এলকায় সিলোনিয়া নদীর তীরসংরক্ষণ বাঁধের একটি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। এ ছাড়া ফুলগাজী উপজেলার একটি রাস্তা ভেঙে মুহুরী নদীতে পড়ে গেছে। ফলে ফুলগাজী বাজার থেকে রাজসপুর সড়কের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক বেলায়েত হোসেন জানান, ২০২৪ সালের আগস্টে ভয়াবহ বন্যার ক্ষয়ক্ষতি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি ফেনীর মানুষ। বৃষ্টি পরিস্থিতিতে আবার বন্যা শুরু হতে পারে। বন্যার ক্ষয়ক্ষতি থেকে বাঁচতে পরিবার ও স্বজনদের নিয়ে এক আত্মীয়ের বাড়িতে চলে যাওয়ার চিন্তা করছি।
ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান বলেন, গত সোমবার বিকেল ৬টা থেকে আজ (গতকাল) মঙ্গলবার বিকেল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ফেনীতে ৪৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আরও দুই দিন ফেনীতে মাঝারি ও ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পশুরাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আবুল কাশেম বলেন, পরশুরাম উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের সিলোনিয়া নদীর বাঁধের একটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এই ভাঙন দিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে।
ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহরিয়া ইসলাম জানান, সকাল সাতটার দিকে ফুলগাজীর রাজেশপুর সড়কের মুহুরী নদীর বাঁধ ভেঙে সড়কসহ দুটি দোকান ধসে গেছে। এতে করে ওই গ্রামের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।
ফেনী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা নাসরিন কান্তা বলেন, ‘এখন প্রায় সব স্কুলেই অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষা চলছে। সড়ক ও স্কুলে পানি ওঠায় অনেক স্কুলে ইতোমধ্যে পরীক্ষা স্থগিত করার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তবে বোর্ড পর্যায়ে চলমান পরীক্ষা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নোটিশ পাওয়া যায়নি।’
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আকতার হোসেন মজুমদার বলেন, উজানে ভারী বৃষ্টি হলে নদীর পানি আরও বাড়বে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বেশ কয়েকটি স্থানে ভাঙনের শঙ্কা রয়েছে।
খুলনা: দুই দিনের ভারী বৃষ্টিতে খুলনা নগরীর জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। নিম্নাঞ্চলে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। খুলনা আবহওয়া অফিসের সূত্র অনুযায়ী, গত সোমবার খুলনায় ৯০ মিলিমিটার ও গতকাল ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে নগরীর টুটপাড়া, রয়েল মোড়, মিস্ত্রিপাড়া, আহসান আহমেদ রোডসহ বিভিন্ন সড়কে পানি জমে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।
মোল্লাপাড়া এলাকার বাসিন্দা ইলিয়াস হোসেন জানান, বৃষ্টি হলেই রাস্তা-ঘাট পানিতে তলিয়ে যায়। কাদাপানিতে চরম ভোগান্তি তৈরি হয়। নিয়মিত পরিষ্কার না করায় পানি অপসারণের ড্রেনগুলো ময়লা-আবর্জনায় আটকে আছে। ফলে বৃষ্টি হলেই ড্রেনের নোংরা পানি চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।
মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন বলেন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, খাল দখল ও নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার না করায় একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। সাড়ে ৫ বছরে কেসিসি প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ব্যয় করে ড্রেন নির্মাণ, খাল খনন করলেও সুফল মেলেনি।
বরিশাল: গত ২৪ ঘণ্টার টানা বৃষ্টির করাণে ডুবে গেছে বরিশাল সিটি করপোরেশনের বেশির ভাগ এলাকা ও রাস্তাঘাট। এর ফলে সীমাহীন ভোগান্তির মুখে পড়েন স্থানীয়রা। গতকাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, নগরীর প্রাণ কেন্দ্র বগুড়া রোড, নবগ্রাম রোড, আমির কুটির, অক্সফোর্ড মিশন রোড, কলেজ অ্যাভিনিউ, গোরস্তান রোড, সার্কুলার রোড, রুপাতলি, সাগরদি, রুপাতলি হাউজিং, ভাটিখানা, আমানতগঞ্জ, রসুলপুর, পলাশপুর, মোহাম্মদপুর, কাউনিয়ার পুরানপাড়া, সেকশন রোড, জিয়া সড়ক, কালুশাহ সড়ক, বৌদ্ধপাড়া, কলেজ রোড, কলেজ অ্যাভিনিউ, কাশিপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকার প্রধান ও অলিগলির সড়কগুলো পানিতে ডুবে আছে।
স্থানীয়রা জানান, বরিশাল নগরে আগে ২৪টি খাল ছিল। আগে বড় ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে এবং ভারী বর্ষণে বরিশাল নগরে পানি জমলেও তা খুব দ্রুত নেমে যেত। তবে ২০০০ সালের পর থেকে বরিশাল নগরের খাল, পুকুর ও অন্য জলাশয়গুলো একে একে ভরাট ও দখল হতে শুরু করে। এ কারণে সামান্য বৃষ্টিতে নগরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
নগরীর ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ভাটিখানা জোড় মসজিদ এলাকার বাসিন্দা রেজাউল কারিম বলেন, সামান্য বৃষ্টিতে কলোনির সড়কে হাঁটুপানি জমে যায়। একদিন বৃষ্টি হলে সেই পানি নামতে ১০ দিনেরও বেশি সময় লাগে।
বরিশাল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ইনচার্জ ও জ্যেষ্ঠ পর্যবেক্ষক আনিসুর রহমান বলেন, গত সোমবার বিকেল ৩টা থেকে গতকাল বিকেল ৩টা পর্যন্ত ৮৩ দশমিক ১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এটি মৌসুমি বৃষ্টিপাত। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় সোমবার সকাল থেকে মাঝারি ধরনের এ বৃষ্টি হতে শুরু হয়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী রফিকুল আলম বলেন, নগরের খাল ও জলাশয় ভরাট করে দখল আর অপ-উন্নয়নের পরিণাম হচ্ছে এই জলাবদ্ধতা। সামনে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, কীর্তনখোলা নদীতে উঁচু জোয়ার থাকায় পানি নামতে সময় লাগে। এতে করে কোনো কোনো সড়কে দুই একদিন পানি জমে থাকে।
সাতক্ষীরা: টানা বর্ষণে সাতক্ষীরা পৌরসভার নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে স্যানিটেশন, খাবার পানি ও রান্না করা নিয়ে বিপাকে পড়ে এসব এলাকার হাজার হাজার পরিবার।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত দুই দিনে প্রায় ৪০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কামালনগর, ইটাগাছা, পলাশপোল, মধুমোল্লারডাঙি, মেহেদীবাগ, রসুলপুর, বদ্দিপুর কলোনি, রইচপুর, মধ্য কাটিয়া, রথখোলা, রাজারবাগান, গদাইবিল, মাঠপাড়া, পার-মাছখোলা ও পুরাতন সাতক্ষীরা অঞ্চলে পানি থইথই করছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ৭ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে।
ইটাগাছা বিলপাড়ার বাসিন্দা নাজমুল হাসান বলেন, ‘ঘের মালিকরা বিলে পানি আটকে রেখেছেন। বাইপাসের স্লুইস গেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানি খালে নামছে না। ফলে ঘর-পথ-আঙিনা সব পানিতে তলিয়ে গেছে।’
বদ্দিপুর কলোনির গৃহবধূ শাহানারা বেগম জানালেন, ১০ বছর ধরে এমনটা হচ্ছে। প্রতিবছরই হচ্ছে। কিন্তু কোনো সমাধান নেই। এবার রান্নাঘরেও পানি উঠেছে। হাঁড়ি-পাতিল নষ্ট হয়ে গেছে। সন্তানদের নিয়ে নিরাপদ জায়গায় যেতে হয়েছে।
কুখরালী এলাকার বাসিন্দা ইকরামুল হাসান অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রভাবশালীরা বিলের মুখ বন্ধ করে মাছের ঘের করছে। খালের মুখে নেট-পাটা বসিয়ে দিয়েছে। ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।’
সমাজকর্মী সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘নদী ও খাল খননে অনিয়ম হয়েছে। কাগজে-কলমে পাড় উঁচু করে গভীরতা দেখানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে পানি বের হওয়ার পথ বন্ধ। ফলে বর্ষার পানি লোকালয়ে ঢুকে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে।’
সাতক্ষীরা আদালতের বিশিষ্ট আইনজীবী ফাহিমুল হক কিসলু বলেন, ‘পৌর মেয়র ও কাউন্সিলররা শুধু নির্বাচনের সময় এলাকায় দেখা দেন। তারা এখন বলছেন, সরকার পরিবর্তনের পর ঠিকাদার পালিয়ে গেছে- তাই কাজ হয়নি। অথচ সমাধান খুব সহজ: নেট-পাটা সরানো, স্লুইসগেট সচল রাখা, প্রকৃত গভীরতা অনুযায়ী খাল খনন ও বাঁধ সংস্কার করা।’
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শোয়াইব আহমাদ বলেন, ‘২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫০ কিমি খাল ও সেচনালা সংস্কার করা হয়েছে। দ্রুত স্লুইসগেট খুলে দেওয়া হবে। প্রাণসায়ের খালে পানি ফেলার বিকল্প ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আশা করছি, এতে জলাবদ্ধতা কিছুটা কমবে।’