‘সবার মৃত্যু তো শহিদি মৃত্যু হয় না, আমার স্বামীর হয়েছে। আমি চাই শহিদের স্ত্রীর মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে, আর এটাই আমার শক্তি।’ কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন গত বছরের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত আল আমিন রনির স্ত্রী মোসাম্মৎ মিম আক্তার।
সম্প্রতি কথা হয় মিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রথমদিকে স্বামীর অনুপস্থিতি আমাকে অনেক পীড়া দিত। তবে এখন নিজেকে বোঝাই। আমার স্বামীর মৃত্যুর সময় মেয়ে রোজা ছিল আমার গর্ভে। ওর বয়স এখন আট মাস। খুব কষ্ট হয় যখন ভাবি বাবার আদর সে পাচ্ছে না।’
জুলাই আন্দোলনের সময় গত বছরের ১৯ জুলাই মারা যান আল আমিন রনি। ওই সময়ে তার স্ত্রী মিম আক্তার পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। পরে গত বছরের ৪ নভেম্বর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। তার নাম রাখা হয় মিথিলা ইসলাম রোজা।
১৯ জুলাই দুপুরে রাজধানীর মহাখালীতে গুলিবিদ্ধ হন রনি। ওই দিন রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ২০ জুলাই রনির লাশ বরিশালের বানারীপাড়ার সলিয়াবাকপুর ইউনিয়নের পূর্ব বেতাল গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে বাবার পাশে দাফন করা হয়। বাবাহারা আল আমিন রনি মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে রাজধানীর মহাখালীর সাততলা বাউন্ডারি বস্তিতে থাকতেন। সেখানকার একটি ওয়ার্কশপে দিনে কাজ করতেন। রাতে অনলাইনভিত্তিক একটি খাবারের প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। বানারীপাড়ার সরকারি ফজলুল হক কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করা রনি সংসারের হাল ধরতে ঢাকা গিয়েছিলেন। তার মা অন্যের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন।
বর্তমানে স্ত্রী মিম তার মেয়েকে নিয়ে থাকেন বানারীপাড়া উপজেলার চাখার ইউনিয়নে বাবার বাড়িতে। আর রনির মা মেরিনা বেগম থাকেন পূর্ব বেতাল গ্রামে স্বামীর ভিটায়। সেই ঘরের সামনে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে শহিদ আল আমিন রনির লাশ।
মিম বলেন, ‘আমার স্বামী কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু কাজের ফাঁকে বন্ধুদের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা নানান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতেন। ১৯ জুলাই দুপুরে মহাখালীতে গুলিবিদ্ধ হন। ওই রাতে তিনি মারা যান।’
তিনি বলেন, ‘আজ আমাদের সন্তান বাবা ডাকটি বলতে পারলেও ওর বাবা তো আর আসেন না! ওকে কিভাবে বলব যে, ওর বাবা আর কোনো দিন ফিরে আসবেন না!’
দাম্পত্য জীবন নিয়ে মিম বলেন, ‘তার সঙ্গে (রনির) যেটুকু স্মৃতি রয়েছে, সবটাই ভালো স্মৃতি। অনেক ভালো মানুষ ছিলেন। সন্তান হওয়ার আগে বলেছিলেন, ছেলে হলে আলিফ আর মেয়ে হলে যেন রোজা নাম রাখি। আমি তার কথা রেখেছি। মেয়ের নাম রোজা রাখা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই ফাউন্ডেশন ও সরকার থেকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে, সেখান থেকে পাওয়া প্রতি মাসের মুনাফা শাশুড়ি ও আমি সমানভাবে ভাগ করে নেই। তিনি প্রতি মাসে আমাদের কাছে আসেন, নাতনির খোঁজখবর নেন।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মিম বলেন, ‘সময় যত যাবে আমাদের সন্তান বড় হবে, ওর ভবিষ্যৎ চিন্তা করে পড়াশোনা শুরু করেছি, একটা চাকরিও খুঁজছি। মুনাফা হিসাবে যে টাকা হাতে আসে, তা দিয়ে চলা কষ্টকর। চাকরি হলে মা-মেয়ের জীবনধারণ কিছুটা সহজ হবে। আমার বাবা অল্প উপার্জন করলেও সেখানে ভালো আছি। মা-বাবা আমার মেয়েকে খুশি রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।’
পূর্ব বেতাল গ্রামে শহিদ রনির বাড়িতে গিয়ে তার মাকে পাওয়া যায়নি। তিনি তার বাবার বাড়িতে গেছেন বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা। সেখানে কথা হয় রনির দাদি মরিয়ম বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, দুলালের (রনির বাবা) বড় পোলার নাম রনি। মোর খোঁজ-খবর রাখত, মাস শেষ হইলেই (হলে) ওষুধ কেনার টাহা (টাকা) পাডাইতে (পাঠাত)। রনিও নাই, এহন আর কেউ টাহা পাডায় না। বউ (রনির মা) ওষুধ কিইন্না (কিনে) দেয়।’
রনির শ্বশুর কামাল হোসেন মাঝি বলেন, ‘বিয়ের পরে জামাইয়ের সঙ্গে মেয়ে ঢাকাতেই থাকত। মেয়ে যখন অন্তঃসত্ত্বা হয়, তখন তাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসি। রনির মৃত্যুর পর মিম অনেকটা নির্বাক হয়ে গিয়েছিল। তারপরও নাতনি রোজার কথা চিন্তা করে সে আবার শক্ত হয়েছে। মেয়ের ইচ্ছাতেই তাকে আবার ফজলুল হক কলেজে অনার্সে ভর্তি করিয়েছি। আমি চাই, মেয়ের মতো আমার নাতনিও যেন পড়াশোনা করতে পারে।’