চট্টগ্রামে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) নগরের ছয়টি এলাকায় জরিপ চালিয়েছে। অতিমাত্রায় এডিস মশার উপস্থিতি পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি এলাকাগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে, যা এরই মধ্যে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত বছরের জরিপে নগরের ২০০টি বাড়ির মধ্যে ৭৪টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গিয়েছিল। সে সময় লার্ভার ঘনত্ব ছিল ৩৬ শতাংশ। জরিপটি চালিয়েছিল চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়। গত ১২ থেকে ১৮ জুলাই নগরের ছয়টি এলাকায় জরিপ চালায় আইইডিসিআর। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক প্রফেসর ড. তাহমিনা শিরিন স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ছয় এলাকার (চট্টেশ্বরী রোড, ও আর নিজাম রোড, আগ্রাবাদ, পাহাড়তলী, হালিশহর ও ঝাউতলা) ১২৮টি বাড়ির মধ্যে ৬২টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। নগরের আটটি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কীটতাত্ত্বিক জরিপ চালিয়ে দেখা যায়, এসব এলাকার এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব ৭৫ দশমিক ২৯ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ।
পাশাপাশি বর্তমান গবেষণায় লার্ভার ঘনত্ব (ব্রুটো ইনডেক্স) পাওয়া গেছে ৭৫ দশমিক ২৯ শতাংশ, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ঝুঁকির সীমা (২০%) থেকে প্রায় চার গুণ বেশি।
ওয়ার্ডভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মশার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি ছিল আগ্রাবাদে ১৩৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। এরপর ধারাবাহিকভাবে নগরের পাহাড়তলীতে ১১০ শতাংশ, হালিশহরে ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, চট্টেশ্বরীতে ৪৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ, ও আর নিজাম রোডে ৪২ দশমিক ৮৬ শতাংশ ও ঝাউতলায় ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এডিস মশার অতিমাত্রার উপস্থিতি এসব এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানকে প্রকাশ করে।
পরীক্ষায় ৬৫ শতাংশ মশা ছিল এডিস ইজিপ্টাই, ৩২ দশমিক ৬৪ শতাংশ ছিল এডিস আলবোপিকটাস এবং বাকিগুলো ছিল মিশ্র প্রজাতির মশা। তা ছাড়া হাউস ইনডেক্সের (নির্দিষ্ট এলাকার কত শতাংশ বাড়িতে মশার লার্ভা) হার ছিল ৪৩.০৪ শতাংশ এবং কনটেইনার ইনডেক্সের (নির্দিষ্ট এলাকার মশার প্রজননস্থল) হার ছিল ৫১.০১ শতাংশ, যা এ এলাকার উচ্চঝুঁকিকেই নির্দেশ করে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে জিকা ভাইরাস, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া সংকটে রূপ নিতে পারে। এটি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
আইইডিসিআরের প্রতিবেদনে তিনটি সুপারিশের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর লক্ষণ বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া। কীটতাত্ত্বিক জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে দ্রুত মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং পর্যায়ক্রমে সিটি করপোরেশনের অন্যান্য ওয়ার্ডগুলোকেও একই কার্যক্রমের আওতায় আনা। মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে জনগণের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা।
এ বিষয়ে সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, ‘প্রতিবেদন হাতে পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলোচনা করে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি চিকুনগুনিয়া শনাক্তে আরটিপিসিআর টেস্ট পরীক্ষা ফি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান যেন দৃশ্যমান স্থানে মূল্যতালিকা প্রদর্শন করে, সে ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা সরফুল ইসলাম মাহি খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রতিবেদনে যেসব ওয়ার্ডকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে, আমরা সেসব ওয়ার্ডে অতিরিক্ত পরিমাণে স্প্রে-ম্যান নিয়োগ দিয়েছি। আমাদের কীটনাশক ছিটানোর মাত্রা বাড়িয়েছি। লিফলেট বিতরণ, মাইকিং করা হচ্ছে। নালাগুলো পরিষ্কার করা, পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা- এসব কার্যক্রম চলমান আছে।’
এদিকে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে গত এক সপ্তাহে ২৫০ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১৮৩ জনের শরীরে চিকুনগুনিয়া পাওয়া গেছে। পার্কভিউ হাসপাতালে ২৬৩ জনের নমুনা পরীক্ষায় ১৪২ জনের চিকুনগুনিয়া ধরা পড়ে। মেট্রোপলিটন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ৫৩ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৩৩ জনের এ রোগ শনাক্ত হয়। পাশাপাশি গত দুই সপ্তাহে বেসরকারি এপিক হেলথকেয়ার সেন্টারে ৩৫৬ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৩১৬ জনেরই চিকুনগুনিয়া ধরা পড়ে।