‘আমরা উত্তপ্ত কড়াই থেকে সরাসরি জ্বলন্ত আগুনে পড়েছি। আমাদের উদ্ধার করার মতো কেউ আছে বলে মনে হয় না। ১৭ বছর এলাকাছাড়া ছিলাম। এখন এলাকায় যেতে গিয়ে মার খেয়ে আহত হতে হলো। তিন দিন বিছানায়। মেরুদণ্ডের ব্যথার জন্য নড়াচড়াও করতে পারছি না।’ খবরের কাগজকে কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা এস এম সাজ্জাদ হোসেন।
শুধু সাজ্জাদ হোসেন নয়, বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের অনেক নেতা-কর্মী জুলাই আন্দোলনের পর এলাকাছাড়া। প্রাণের ভয়ে অনেকেই নিজ বাড়িতে যেতে পারেন না। কারণ এখানে প্রতি মাসে একটির বেশি খুন হচ্ছে। ডাকাতি, ছিনতাই, মারামারি, গোলাগুলি যেন রুটিন কাজে পরিণত হয়েছে। পুলিশ প্রশাসন বলছে এ সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক নেতাদের সদিচ্ছা দরকার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষে রাউজানকে শান্ত করা বেশ কঠিন।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১১ মাসের মধ্যে উপজেলাজুড়ে রহস্যজনক মৃত্যুসহ অন্তত ১৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে; যার মধ্যে রয়েছে পরিকল্পিত অপহরণ, গুলি করে হত্যা, পিটিয়ে খুন এবং রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়ার পর মরদেহ উদ্ধার। প্রায় প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ব্যক্তি দ্বন্দ্ব কিংবা আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা।
রাউজানে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট অপহরণের পর হত্যার শিকার হন আবদুল মান্নান (২৮)। এ ঘটনার পাঁচ দিন পর ১ সেপ্টেম্বর একটি গলির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় ইউসুফ মিয়া (৬৫) নামে এক ব্যক্তির লাশ। ১১ নভেম্বর চিকদাইরে হাফেজ আবু তাহের (৪৮) নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর তার ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি নোয়াপাড়ায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় মো. জাহাঙ্গীর আলমকে (৫৫)। ১৯ ফেব্রুয়ারি নোয়াপাড়ায় পিটিয়ে হত্যা করা হয় মুহাম্মদ হাসানকে (৩৫)। এরপর ১৫ মার্চ হলদিয়ায় ইফতার বিতরণ নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সহিংসতায় নিহত হন কমর উদ্দিন জিতু (৩৬)। ২১ মার্চ পূর্বগুজরায় গরুচোর সন্দেহে জনতার হাতে গণপিটুনিতে নিহত হন মো. রুবেল (৩৫), যাতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার অনুসারীদের উসকানি ছিল বলে অভিযোগ আছে। ১ এপ্রিল পারিবারিক জমি নিয়ে বিরোধে খুন হন নূর আলম বকুল (৪৩)। ১৭ এপ্রিল পাহাড়তলী ইউনিয়নে মো. জাফরের (৪০) লাশ উদ্ধার করা হয়। একই মাসে বিএনপিকর্মী মানিক আবদুল্লাহ (৩৬) নিজ দলের লোকজনের হাতে গুলিতে নিহত হন। ২২ এপ্রিল রাউজান সদর ইউনিয়নের গাজিপাড়ায় গুলি করে হত্যা করা হয় ইব্রাহিমকে (২৮)। ৩ জুলাই উরকিরচরে কিশোরদের ধূমপান নিয়ে বিরোধ থামাতে গিয়ে তাদের হামলায় প্রাণ হারান মো. আলমগীর। ৬ জুলাই কদলপুরে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় মুহাম্মদ সেলিমকে (৪০)। ১০ জুলাই বেতবুনিয়ার লুঙ্গিপাড়ায় উদ্ধার করা হয় দিদারুল আলমের (৪০) লাশ। তার মৃত্যু রহস্যজনক ছিল বলে অভিযোগ আছে। ২৫ জুন কর্ণফুলী নদীর পাড়ে যুগীপাড়া বোট ঘাট এলাকায় বালিচাপা দেওয়া অবস্থায় পাওয়া যায় রুপন নাথের (৩৭) লাশ।
শুধু খুনই নয়, রাতের অন্ধকারে প্রতিনিয়ত বসতঘরে চুরির পাশাপাশি সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও গরু চুরি হচ্ছে। ১১ জুলাই গভীর রাতে নোয়াজিষপুর ইউনিয়নে চোর চক্র চারটি গরু চুরি করে নিয়ে যায়। ১৭ জুলাই রাতে গশ্চি গরিব উল্লাহ পাড়ায় মোহাম্মদ খানের নতুন বাড়ি খান নিবাসে হানা দিয়ে চোরেরা প্রায় আট ভরি স্বর্ণালংকার, নগদ ৮৫ হাজার টাকা নিয়ে যায়। ১৮ জুলাই কদলপুর দক্ষিণ শমসের পাড়ায় আবদুল নবীর ছেলে আবদুর রহিমকে পিটিয়ে তার হাত-পা ভেঙে দেয় দুর্বৃত্তরা।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার বিকেলে উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম আকবর খোন্দকারের গাড়িবহরে হামলা, গাড়ি ভাঙচুর, মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় অন্তত ৩০ জন আহত হন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধীরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
১১ মাসে ১৫ হত্যাকোণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে রাউজান থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘১৫ জন নয়, ১৩টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ছয়টি রাজনৈতিক বিরোধের কারণে ঘটেছে। বাকি সাতটি ব্যক্তিগত, জমিসংক্রান্ত, আত্মহত্যা, গণপিটুনি এবং পারিবারিক কলহের জেরে ঘটেছে। এর মধ্যে আত্মহত্যার মামলা এবং সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরীর বাড়িতে লাশ পাওয়ার মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।’
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শিল্পাঞ্চল ও ডিবি) ও জেলা পুলিশের মুখপাত্র মো. রাসেল খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাজনীতিবিদরা বলছেন মাটি, বালুর ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে খুনের ঘটনা ঘটছে। অপরাধ বন্ধ করতে হলে রাজনৈতিক নেতাদের মূল ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে রাউজানকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে এ কথা বলার সুযোগ নেই। পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পুলিশ কাজ করছে।’