আধাপাকা বাড়িটির ভেতরে হাঁটুসমান ময়লা পানি। কয়েকটি হাঁস ওই পানিতে সাঁতার কাটছে। উঠানে জমে থাকা পানির মধ্যেই একাধিক শিশু হাঁটাহাঁটি করছে। তাদের পায়ে চর্মরোগের ক্ষত। ঘরের ভেতরে আসবাবপত্রের পায়াগুলো পানিতে ডুবে আছে। অধিকাংশেই পচন ধরেছে। শোয়ার ঘরেও একই অবস্থা। বাদ যায়নি রান্নাঘর, গোসলখানা এমনকি শৌচাগারও। সবখানেই ময়লাপানি। তিন মাস ধরে এই বাড়ির সবাই চর্মরোগে আক্রান্ত।
বর্ণনা শুনে মনে হতে পারে একটি যশোর জেলার প্রত্যন্ত ভবদহ এলাকার চিত্র। চার দশক ধরে ভবদহ এলাকার মানুষ জলাবদ্ধতার সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। যশোর শহর থেকে ভবদহের দূরত্ব অন্তত ৩০ কিলোমিটার। শহুরে জীবনে এর প্রভাব না পড়ায় এই সমস্যার সমাধানে গতি আসেনি। কিন্তু এতক্ষণ যে বর্ণনা আমরা পেলাম তা ভবদহের নয়। এটি কুমিল্লা শহরতলীর চানপুর এলাকার রুবিনা আক্তারের বাড়ির চিত্র। কুমিল্লা নগরের প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড় থেকে চানপুর এলাকার দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। কিন্তু সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে হওয়ায় এখানকার দুর্ভোগ নিয়ে যেন কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। পরিস্থিতি এমন, যেন বাতির নিচে অন্ধকার।
রুবিনা আক্তার বলেন, ‘চানপুর এলাকায় এই সমস্যা দীর্ঘদিনের। একবার বর্ষার পানি জমলেই বছরের বেশির ভাগ সময় বাড়িঘর, রাস্তা ডুবে থাকে। পানি সরার জায়গা নেই। সবার চর্মরোগ হয়ে গেছে। খাবার পানি ফুটিয়ে খেতে হয়। একটু অসচেতন হলেই সবাই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। এই অবস্থায় থাকা যায় না। মধ্যবিত্ত হওয়ায় আমরা নিরুপায় হয়ে নিজের বাড়িতে থাকছি। নইলে কবে চলে যেতাম!’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুমিল্লা শহরতলীর চানপুর এলাকা পড়েছে পাঁচথুবি ইউনিয়নে। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এখানকার অর্ধলক্ষাধিক মানুষ জলাবদ্ধতার সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। অপরিকল্পিত বাড়ি নির্মাণ এবং পুরানো গোমতী নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছের ঘের করায় পানি নিষ্কাশনের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। বর্ষায় জমে যাওয়া পানি শুকাতে পরের বছরের বর্ষা চলে আসে। চলতি বর্ষায় তাদের ভোগান্তি কয়েকগুণ বেড়েছে। দীর্ঘ জলাবদ্ধতার কারণে এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভাব পড়েছে। কমে গেছে যান চলাচল। কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিতে বেগ পেতে হয়। রাত হলে বাড়ে বিষাক্ত সাপের ভয়। প্রশাসন জানিয়েছে, চানপুরের বাসিন্দাদের জলাবদ্ধতা ভোগান্তির বিষয়টি নজরে এসেছে। সমস্যা সমাধানে প্রকৌশল বিভাগ ও স্থানীয় চেয়ারম্যানকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, চানপুর এলাকাটি সিটি করপোরেশনের বাইরে হলেও এটি কুমিল্লা শহরের পুরোনো আবাসিক এলাকা। পুরোনো গোমতী নদীর দুই আইলের মাঝে গড়ে ওঠা এ অঞ্চলটি খুবই ঘনবসতিপূর্ণ। বহুতল ভবনসহ কাঁচা-আধাপাকা বাড়িতে বসবাস করা এই এলাকায় প্রায় সবাই স্থায়ী বাসিন্দা। চানপুর বেবিস্ট্যান্ড থেকে শুরু করে পাক্কারমাথা পর্যন্ত প্রধান সড়কের প্রায় দেড় কিলোমিটারজুড়ে যত বাড়িঘর আছে সবগুলোই প্রায় জলাবদ্ধ।
স্থানীয় বাসিন্দা সেলিম চৌধুরী বলেন, আগে শুধু রাস্তা ডুবে থাকত এখন বাড়িঘরও ডোবে। ২০-২৫ বছর ধরে এই সমস্যা। দিন দিন তা আরও বাড়ছে। সবাই পরিকল্পনা ছাড়া বাড়িঘর করেছে। আর এই চানপুরের পূর্ব দিক দিয়ে টিক্কারচর এলাকায় পানি অপসারণের জায়গায় বাঁধ দিয়ে অনেকে মাছ চাষ করছে। এতে এই এলাকা থেকে পানি সরে না।
শাহ আলম মজুমদার নামে একজন বলেন, আমরা ছোট বেলায় দেখেছি-মধ্যমপাড়া মসজিদ থেকে একটু দক্ষিণে নালার মতো ছিল। গোমতীতে পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেনও ছিল। সব ভরাট হয়ে গেছে। কিছু অসচেতন মানুষের জন্য পুরো এলাকার মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। প্রশাসনকে জানাতে জানাতে আমরা ক্লান্ত হয়ে গেছি।
৫ নম্বর পাঁচথুবী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী তানভীর আহমেদ রাহুল বলেন, সুদৃষ্টি পাই না বলেই এসব সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়। সমস্যা নিরসনে কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েও লাভ হয়নি। পানি অপসারণের রাস্তা বন্ধ থাকায় এ সমস্যা।
আদর্শ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা তুজ জোহরা বলেন, জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়া এলাকাগুলোর তালিকা করছি। ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা প্রকৌশলীকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সমস্যা সমাধানের উপায় জানাতে বলা হয়েছে।