বাড়ি থেকে বের হওয়ার পথ না থাকায় চরম ভোগান্তি এবং অমানবিক জীবনযাপন করছেন কাঁঠালিয়ার শ্রমজীবী মো. শের আলীর পরিবারসহ তিনটি পরিবার।
২০১৮ সালের বর্ষা মৌসূমে রাতে অসুস্থ হয়ে পড়েন শ্রমজীবী মো. শের আলীর স্ত্রী জোছনা বেগম। মুঠোফোনে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে রোগের ধরন অনুযায়ী তিনি সকাল ৬টার মধ্যে রোগী নিয়ে দেখা করতে বলেন। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পথ না থাকায় প্রতিবেশিরা কেউ এগিয়ে আসেনি সাহায্য করতে। পরিবারের লোকজন নিয়ে অনেক কষ্ট করে হাতে হাতে ধরে বের হতে সকাল ৯টা পেরিয়ে যায়। একটি ভ্যানে করে নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। জোছনা বেগম তখন ৩বছরের ছেলে ও ৫বছর বয়সী মেয়েকে রেখে যান। ছেলে মো. ইয়াছিন (১১) হাফেজি মাদ্রাসায় পড়ে এবং মেয়ে লামিয়া আক্তার এবার এসএসসি উত্তীর্ণ হয়েছে। শের আলীর বড় ভাই আব্দুর রাজ্জাক ওরফে নাগর আলী কাঁচা মালের ব্যবসা করেন। ভ্যানগাড়িতে করে বাজারে বাজারে ঘুরে শাক-সবজি বিক্রি করেন তিনি। তিনি এক মেয়ে ও এক ছেলে সন্তানের জনক।
পারিবারিক অভাব-অনটনের মধ্যেও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন সন্তানদের। ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় নিয়ে মেয়ে আসমা আক্তারকে বিয়ে দিয়েছেন। ওই বাসা থেকেই বরপক্ষ মেয়েকে নিয়ে যান। বাড়িতে যাতায়াতের পথ না থাকায় দীর্ঘ ৫বছরেও জামাইসহ মেয়ের বাড়ির লোকজনকে বেড়াতে (নাইওর) আনতে পারেননি বাড়িতে ঢোকার পথ না থাকায়।
ছেলে আসলাম হোসেন রাসেল বিএসসি উত্তীর্ণ হয়েছে, কিন্তু তার কোন সহপাঠি বা বন্ধুকেও বাড়িতে আনতে পারছেন না।
ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন গার্মেন্টস কর্মী। তিনি ২০০৩ সালে বিয়ে করেছেন যশোরের রুকসানা আক্তারকে। তাদের সংসারে ২ মেয়ে- বড় মেয়ে রেজওয়ানা আফরিন উর্মী অনার্সের ছাত্রী এবং ছোট মেয়ের বয়স দুই বছর। মেয়ে বিয়ের উপযুক্ত হলেও বাড়ি যাতায়াতের পথ না থাকায় কোনো প্রস্তাব আসছে না, মেয়ে দেখতেও আসছেন না। যাতায়াতের পথ না থাকায় এভাবেই তিনটি পরিবার যুগের পর যুগ ধরে চরম অমানবিক জীবনযাপন করছেন।
ঝালকাঠি জেলার কাঠালিয়া উপজেলার দক্ষিণ শৌলজালিয়া গ্রামে বিরল এ অমানবিক জীবনযাপন, যা দেখলে যে কারোরই মন কুকড়ে উঠবে। প্রশ্ন তুলবে কীভাবে এমন জীবনযাপন করা সম্ভব?
শের আলী বলেন, 'পূর্বপুরুষ থেকেই আমাদের যাতায়াতের কোন পথ নাই। আমাদের সীমাহীন কষ্টে চলাফেরা করতে হচ্ছে। তবুও জীবন চলছে অন্যের জায়গা দিয়ে হাঁটা, অন্য বাড়ি থেকে পান করার পানি সংগ্রহ করা। এজন্য অনেক সময় ভিন্ন ধরনের কথা শুনতে হয় প্রতিবেশীর।
অশ্রুভরা চোখে তিনি বলেন, ২০১৮ সালে বর্ষার মৌসূমে মধ্যরাতে হঠাৎ আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাৎক্ষণিক একজন চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করি। তিনি অসুস্থতার ধরন শুনে সকাল ৬টার মধ্যে তার কাছে যেতে বলেন। কিন্তু অতো সকালে তাকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বাড়ি থেকে বের হবার পথ নেই। একজন সুস্থ্য মানুষেরই বের হতে অনেক কষ্ট হয়, তারপর অসুস্থ্য মানুষ নিয়ে কিভাবে বের হব? তবুও নিকটাত্মীয়দের সহযোগিতায় হাতে হাতে ধরে তাকে নিয়ে হাসপাতালে ৯টা বেজে যায়। ততক্ষণে সে দুনিয়া ছেড়ে চির বিদায় নেয়।
তখন ৩বছর বয়সী দুধের ছেলে ও ৫বছর বয়সী মেয়েকে রেখে যায়। বর্ষায় বাড়িতে ঢুকার পথ না থাকায় আমার স্ত্রীর জানাজা পড়তেও তেমন লোকজন আসতে পারেনি। ছেলেটি হাফিজি মাদ্রাসায় পড়ে এবং মেয়েটি এ বছর এসএসসি উত্তীর্ণ হয়েছে। মেয়ের বিয়ে দেয়া নিয়ে বড়ই দুশ্চিন্তায় আছি। আমাদের পথ ঘাট নেই, মেয়েকে কেউ বিয়ে করতেও আসবে না।
বড় ভাই আব্দুর রাজ্জাক ওরফে নাগর আলীর স্ত্রী ফিরোজা বেগম (৫৮) বলেন, আমার স্বামী কাচামালের (শাক-সবজি) ব্যবসা করেন। আমাদের বিয়ের সময় তখন তার বাজারে আড়ত ছিল। বাবার বাড়ির লোকজন তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কথা বলে বিয়ে চুড়ান্ত করেছেন। তাদের সিদ্ধান্তেই আমাদের বিয়ে হয়েছে। কিন্তু বিয়ের বয়স ৪৫বছর হলেও আমার বাবার বাড়ি থেকে এখন পর্যন্ত কেউ বেড়াতে আসেনি। ছেলে-মেয়ে দুটোকে পড়াশুনা করিয়ে উচ্চশিক্ষিত করেছি। মেয়েটাকে ঢাকায় ওর মামার বাসায় নিয়ে বিয়ে দিয়েছি। তখনই তারা নিয়ে গেছে। ৫ বছর অতিবাহিত হয়েছে। বাড়িতে ঢোকার পথ না থাকায় জামাইসহ মেয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে কোনো মেহমান আজ পর্যন্ত বেড়াতে আসেনি। ছেলেটাও প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে, বিয়ে করানো প্রয়োজন। কিন্তু যাতায়াতের পথ না থাকায় কোনো ঘটক আসছে না বা মেয়ের পক্ষ আমাদের সঙ্গে আত্মীয়তা করতেও আগ্রহী হচ্ছে না।'
তিনি আরও বলেন, তাছাড়াও আমার দুই দেবরের দুটি মেয়ে আছে, তারাও বিবাহ উপযুক্ত। তাদের জন্যও কোনো প্রস্তাব আসছে না। সরকারী সম্পত্তির একটা হালোট তাও বেদখল হয়ে আছে। সেখান থেকে যদি আমাদের চলাচলের জন্য রাস্তার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের একটু হলেও সস্তি আসত।
ছোট ভাই আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী রুকসানা বলেন, '২০০৩ সালে ঢাকায় চাকুরিকালীন আমাদের বিয়ে হয়েছে, বাবার বাড়ি যশোরে। বিয়ের পরে আমরাই শুধু বেড়াতে যাই, বাবার বাড়ির কাউকে এখন পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আনতে পারিনি। চলাচলের পথ না থাকায় তাদের আসতেও বলতে পারছি না। মেয়ে বড় হইছে, অনার্সে পড়ে। ওর জন্যও কোন প্রস্তাব আসছে না। আমাদের পথ না থাকলে মেহমান আসবে কিভাবে? বলে ওড়না দিয়ে চোখের পানি মুছেন তিনি। আব্দুর রাজ্জাক ওরফে নাগর আলী জানান, এই রাস্তার জন্য ইউনিয়ন পরিষদে বহুবার গেছি। নির্বাচনের আগে এবং পরে জনপ্রতিনিধিরা শুধু আশ্বাসই দেন। তারা বাস্তবায়নে কোন পদক্ষেপ নেয় না। আমরা শ্রমজীবী মানুষ, বারবার যেতেও পারছি না। তাহলে আবার সংসারের উপার্জন বন্ধ হয়ে যাবে। মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছি, তাকেও দেখতে যেতে পারি না। মেয়ে-জামাইকেও এখন পর্যন্ত বাড়িতে আনতে পারিনি।'
শৌলজালিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক এবং হক্কেন্নুর দরবার শরীফের পীর মো. মঞ্জিল মোর্শেদ ওই তিন ভাইয়ের অসহায়ত্বের কথা প্রকাশ করে সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রতিকারের ব্যবস্থা দাবি করেন।
স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী গোলাম সরোয়ার শহীদ বলেন, আব্দুর রাজ্জাকের আরও দুইজন ছোট ভাই আছেন। ওরা তিনটি পরিবার একই বাড়িতে বসবাস করেন। কিন্তু ওদের বাড়িতে যাতায়াতের কোনো পথ নেই। কেউ অসুস্থ হলেও বাড়ি থেকে বের করা যায় না। এ কারণেই শের আলীর স্ত্রী বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে। অন্যের ঘরের পাশ, পিছন দিয়ে চলাফেরা করতে গিয়ে অনেকসময় প্রতিবেশীর ভিন্ন ধরনের কটাক্ষমূলক কথাও শুনতে হয়। সুপেয় পানির ব্যবস্থাও নেই। চরম অমানবিক জীবনযাপন করতে হচ্ছে ৩টি পরিবারের লোকজনকে।
তিনি আরও বলেন, ওদের বাড়ির পাশেই সরকারী জমির একটি হালোট রয়েছে। যা বেদখল হয়ে আছে। স্থানীয় সরকার থেকে যদি উদ্যোগ গ্রহণ করে হালোট দিয়ে যাতায়াতের ব্যবস্থা করে তাহলে তারা ৩টি পরিবার অমানবিক জীবনযাপন থেকে রক্ষা পেত।
স্থানীয় ইউপি সদস্য শামসুল আলম বলেন, আব্দুর রাজ্জাক ওরফে নাগর আলীরা তিনভাই যে বাড়িতে বসবাস করে, ওদের চলাচলের কোন পথ নেই। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে বরাদ্দ পেলে তাদের যাতায়াত পথের ব্যবস্থা করা হবে।
কাঁঠালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, আমিতো জানতাম না কেউ এ বিষয়ে আমার কাছে কোনো আবেদন করেনি। আমি খোঁজ নিচ্ছি। ওই পরিবারগুলোকে আমার কাছে আবেদন দিতে হবে। আবেদন পেলে আমি ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব।