‘আমরা মরে গেলাম, রেনের (ঋণের) দায়ে আর খাওয়ার (খাবারের) অভাবে’।
শুক্রবার (১৫ আগস্ট) সকালে রাজশাহীর পবা উপজেলায় একই পরিবারের চারজনের লাশ উদ্ধারকালে পাশেই পাওয়া দুই পাতার চিরকুটের একটি লাইনে এ কথা লেখা ছিল।
ঘটনাটি ঘটেছে রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের বামুনশিকড় গ্রামে। গতকাল সকাল পৌনে ৯টার দিকে বিষয়টি জানাজানি হয়। দুপুরের দিকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) দুটি টিম ঘটনাস্থলে ছুটে যায় এবং বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। এরপর মতিহার থানা পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য লাশগুলো রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
নিহতরা হলেন মিনারুল ইসলাম (৩৬), তার স্ত্রী মনিরা বেগম (৩২) এবং তাদের ছেলে মাহিন (১৩) ও দেড় বছরের মেয়ে মিথিলা। মাহিন খড়খড়ি উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত। মিনারুল দিনমজুর ছিলেন।
এদিকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান রাজশাহী মহানগর পুলিশ (আরএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে দুই সন্তান ও স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যার পর মিনারুল গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তবে এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।’
চিরকুটের এক পাতায় লেখা আছে, ‘আমি মিনারুল নিচের যেসব লেখা লেখবো। সব আমার নিজের কথা লিখে জাছি (যাচ্ছি) এই কারনে, আমরা চারজন আজ রাতে মারা জাবো (যাবো)। এই মরার (মৃত্যুর) জন্য কারো কোন দস (দোষ) নেই। কারন লেখে না গেলে বাংলার পুলিশ কাকে না কাকে ফাসা (ফাঁসিয়ে) টাকা খাবে। আমি মিনারুল প্রথমে আমার বোকে (স্ত্রী) মেরেছি। তারপর আমার মাহিনকে মেরেছি। তারপর আমার মিথিলাকে মেরেছি। তারপর আমি নিজে গলাতে ফাস দিয়ে মরেছি।
আমাদের চার জোনের মরা মুখ যেন বাপের বড় ছেলে ও তার বো বাচ্চা না দেখে। এবং বাপের বড় ছেলে যেনো জানাজায় না যায়। আমাদের চার জনকে কাফন দিয়ে ঢাকতে আমার বাবা টাকা যেন না দেয়। এটা আমার কসম (ইতি মিনারুল) আচছালামু আলাই কুম।’
চিরকুটের অপর পাতায় লেখা আছে, ‘আমি নিজ হাতে সবাকে মারলাম এই কারনে যে, আমি একা জদি (যদি) মরে যাই, তাহলে আমার বো (বৌ), ছেলে, মেয়ে কার আশায় বেচে (বেঁচে) থাকবে। কষ্ট আর দুঃখ ছাড়া কিছুই পাবে না। আমরা মরে গেলাম, রেনের (ঋণের) দায়ে আর খাওয়ার (খাবারের) অভাবে। এত কষ্ট আর মেনে নিতে পারছি না। তাই আমাদের (আমরা) বেচে থাকার চেয়ে মরে গেলাম, সেই ভাল হলো। কারও কাছে কিছু চাই (চাইতে) হবে না। আমার জন্নে (জন্যে) কাওকে মানুসের কাছে ছোট হতে হবে (না) আমার বাবা আমার জন্য, অনেক লোকের কাছে ছোট হয়েছে আর হতে হবে না। চিরদিনের জন্য চলে গেলাম।
আমি চাই সবাই ভাল থাকবেন।
ধন্যবাদ’
গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বামসশিকড় গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মিনারুলের বাড়িতে কয়েক শ মানুষের ভিড়। বাড়ির একটি কক্ষে ঝুলছিল মিনারুলের লাশ। সেই কক্ষে বিছানায় পড়েছিল মাহিনের লাশ। আর পাশের কক্ষে বিছানায় পড়েছিল স্ত্রী মনিরা ও মেয়ে মিথিলার লাশ। এদিকে বিলাপ করছেন, মিনারুলের বাবা রুস্তম আলী।
তিনি জানান, সাত-আট বছর আগে মিনারুলের ঋণ পরিশোধের জন্য তিনি জমি বিক্রি করেন। জমি বিক্রি করে তার ঋণ পরিশোধ করেছিলেন। মিনারুল পরে আবার ঋণগ্রস্ত ছিল কি না, তা তিনি জানেন না। সকালে মিনারুলসহ অন্যদের ডাকাডাকি করেন তিনি। তবে কারও সাড়া পাননি। পরে মই দিয়ে উঠে জানালা দিয়ে দেখতে পান মিনারুলের লাশ ঝুলছে। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
মিনারুলের শাশুড়ি আনসুরা বেগম জানান, তার মেয়ের সঙ্গে মিনারুলের কোনো ধরনের কলহ ছিল না। তারা পরিবার নিয়ে ভালো ছিলেন। কিন্তু কেন এ ঘটনা ঘটল, তা তিনি জানেন না।
স্থানীয়রা জানান, মিনারুল একসময় জুয়া খেলতেন। এতে তিনি অনেক টাকা ঋণ করেন। কখনো ভ্যান চালাতেন। আবার কখনো দিনমজুরের কাজ করতেন। তবে অনেক সময় তাদের দুবেলা খাবারও জুটত না।
পারিলা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার সুজন কবির বলেন, ‘মিনারুলকে প্রতি সপ্তাহে ২ হাজার ৭০০ টাকা কিস্তি দিতে হতো। এর আগে সে কিডনি বিক্রি করতেও গিয়েছিল। আমরা যেটুকু জানি, সে কৃষিকাজ করত এবং জুয়া খেলার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল।’
পারিলা ইউপির চেয়ারম্যান সাঈদ আলী মোর্শেদ বলেন, ‘তিন দিন আগে মিনারুল আমার কাছে গিয়ে বলে, বাড়িতে খাবার নাই। টাকা দেন। আমি ২ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। আগে তাস খেলত। পরে নাকি সে খেলাও বাদ দিয়েছিল।’