‘দেড় বছর বয়সে সে তার বাবাকে হারিয়েছিল। তাকে কোলে-পিঠে করে মানুষ করে বিয়ে করাইছি। এখন নিজের সন্তান দুনিয়াতে আসার আগেই সে পরপারে চলে গেল। আমি কীভাবে থাকব, তার বউটা কীভাবে বাঁচবে।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বারান্দায় বিলাপ করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন ফৌজদারহাটে দুর্ঘটনায় নিহত রনি দাসের মা রাজবালা দাস।
তিন বছর আগে সুমি দাসের সঙ্গে বিয়ে হয় রনি দাসের। সুমি এখন চার মাসের অন্তঃসত্বা। অনাগত সন্তানের মুখ দেখার আগে সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিল রনির প্রাণ। ফৌজদারহাট সংলগ্ন জেলে পাড়ায় দেখা যায়, অঝোরে কাঁদছে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত রনির বোন সৌমিত্রা দাস ও পরিবারের সদস্যরাও।
রনি ছাড়া সীতাকুণ্ডে ফৌজদারহাট জেলেপাড়ার বাসিন্দা অজিত দাস ও আকাশ দাসও এই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।
এছাড়া সোনাইছড়ি ফুলতলা এলাকার বসবাস করতো পিকআপভ্যান চালক সোহেল। একই এলাকার এতগুলো মানুষের একসঙ্গে মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
রনি দাসের মা জানান, তার ছেলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে ক্লিনারের কাজ করতো। আর্থিক অনটন ঘোছাতে ফিশারিঘাট থেকে মাছ এনে পাড়ায় বিক্রি করতো।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সোমবার (১৮ আগস্ট) ভোরে মাছ আনার জন্য সীতাকুণ্ড থেকে চট্টগ্রাম নগরীর ফিশারিঘাটে যাচ্ছিলেন পাঁচ মাছ ব্যবসায়ী। মহাসড়কে দাঁড়িয়ে থাকা কাভার্ডভ্যানের সঙ্গে ধাক্কা লেগে পিকআপভ্যানে থাকা পাঁচজন নিহত হন। নগরীর সিটি গেট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
ইতালি যাওয়া হল না আকাশের
একই গ্রামের ইতালি প্রবাসী বালি দাসের একমাত্র পুত্র আকাশ দাসের স্বপ্ন ছিল তার বাবার কাছে যাওয়ার। ইতালি যাওয়ার জন্য কাগজপত্র ঠিক করার কাজও চলছিল। আগামী বছরে তার ইতালি যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে পরিবারের সদস্যরা জানান। কিন্তু দুর্ঘটনায় সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। পরিবারে মা ও পাঁচ বোনের কান্নায় আশেপাশের লোকজনও চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না। ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।
রাতের আনন্দ ভোরে বিষাদে পরিণত
রবিবার রাতে জেলে পাড়ার সবাই যোগ দিয়েছিলেন মনসা পুঁজায়। রাতে বাড়ির মন্দির সংলগ্ন পূজার উৎসবে নেচে গেয়ে সবাইকে মাতিয়েছেন ২৫ বছর বয়সী আকাশ। দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া একই গ্রামের বাসিন্দা অজিত ও ছেলে প্রমিক দাসসহ মেয়েদের নিয়ে রাতে মনসা পূজায় উৎসবে যোগ দেন। রাতে সন্তানদের ঘরে রেখে মাছ আনার জন্য চট্টগ্রাম ফিশারিঘাট যাওয়ার সময় দুর্ঘটনায় তিনিও নিহত হন। অজিত এক ছেলে ও দুই মেয়ে রেখে গেছেন।
অজিত দাসের স্ত্রী টুকি রানি জানান, রবিবার রাতে তার স্বামী বাড়ি থেকে বের হন। কোথায় যাচ্ছেন সে বিষয়ে কিছু বলে যাননি। এরপর সকালে স্বামীর মৃত্যুর খবর শোনেন।
তিনি বলেন, ‘আমার মেয়েটা বাবাকে ছাড়া একটা সেকেন্ড থাকতে চায় না। সকালেও ঘুম থেকে উঠে বাবারে খুঁজতেছে। আমি আমার ছেলে-মেয়েদের নিয়ে এখন কই যাব, কীভাবে বাঁচব, কীভাবে চলব।’
চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘দুর্ঘটনায় পিকআপভ্যানটি দুমড়ে মুচড়ে গেছে। তাতেই বুঝা যাচ্ছে পিকআপের বেশ গতি ছিল। হতাহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।’
আকবর শাহ থানার উপ-পরিদর্শক মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, দুর্ঘটনাকবলিত পিকআপভ্যানটি ঘটনাস্থলের পাশেই রয়েছে। এ ঘটনায় থানায় অপমৃত্যু মামলা করা হবে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনায় নিহতরা ও আহতরা সীতাকুণ্ডে বাসিন্দা। তাদের মধ্যে তিনজন সলিমপুর ফৌজদারহাট জেলে পল্লীর বাসিন্দা। সবার পরিবারের খোঁজ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান।
> চট্টগ্রামে পিকআপ-কাভার্ডভ্যান সংঘর্ষে নিহত ৫
মাহফুজ/অমিয়/