চট্টগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্র পরীর পাহাড়ের পাদদেশের একাংশে একটি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। স্টিল স্ট্রাকচারের নির্মাণাধীন এই স্থাপনার পাশ দিয়ে যাতায়াত করে প্রতিদিন পাহাড়ের ওপর অফিস করেন জেলা প্রশাসন ও বিভাগীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা। একইভাবে প্রতিদিন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ভবনে আসা-যাওয়া করেন সিডিএর চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী। সবার চোখের সামনে এ রকম একটা জায়গায় পাহাড়ের একাংশে অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ করা হলেও কেউ বাধা দিচ্ছেন না।
নিয়ম ও আইন অনুযায়ী প্রথমেই বাধা দেওয়ার কথা পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির। এই পাহাড়েই বসেন পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির কর্তাব্যক্তিরা। অন্যদিকে অনুমোদন না নেওয়ার কারণে বাধা দিতে পারতেন সিডিএর কর্মকর্তারা। কিন্তু অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে তাদের বাধা না দেওয়ার ঘটনা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি তৎকালীন জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান পরীর পাহাড়ের জায়গা অবৈধভাবে দখল করে গড়ে ওঠা স্থাপনা উৎখাতে অভিযান চালিয়ে ভেঙে দিয়েছিলেন। উচ্ছেদের পর সেখানে বাগান করার পরিকল্পনা ছিল। তিনি বদলি হয়ে গেলে নতুন জেলা প্রশাসক হয়ে আসেন ফরিদা খানম। সম্প্রতি দুটি পৃথক চুক্তিতে ২১ শতক জায়গা পাঁচ বছরের জন্য লিজ দিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। চুক্তির কপিতে দেখা যায়, ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে হওয়া চুক্তিপত্রে জেলা প্রশাসক নিজেই স্বাক্ষর করেছেন।
সরেজমিন দেখা গেছে, জায়গাটি উঁচু টিন দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কী হচ্ছে। কিন্তু ভেতরে চলছে স্টিল স্ট্রাকচারের বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ। এরই মধ্যে তিনতলার অবকাঠামো নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে এখনো ছাদ দেওয়া হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির ৩১তম সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে পাহাড়ে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা নিষিদ্ধ। কমিটিতে সিদ্ধান্ত হয়, যেসব জায়গায় বাস্তবে পাহাড় রয়েছে, কিন্তু রেকর্ডীয় শ্রেণি জরিপকালে নাল, ছনখোলা, আবাসিক ভিটি ইত্যাদি দেখানো হয়েছে; সেগুলোর রেকর্ডীয় শ্রেণি পরিবর্তন করে বাস্তব অবস্থায় ফেরত আনার জন্য জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এই কমিটির সভাপতি বিভাগীয় কমিশনার এবং সদস্যসচিব চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাদিউর রহমান জাদিদ।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাদিউর রহমান জাদিদ বলেন, ‘জায়গাটি আমরা একসনা বন্দোবস্তি (লিজ) দিয়েছি। সেখানে কোনো পাকা স্থাপনা নির্মাণ না করার শর্তে লিজ দেওয়া হয়েছে।’ চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের জবাবও একই রকম।
ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল অমান্য
বাংলাদেশ ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল ও খাসজমি বন্দোবস্ত নীতিমালা অনুযায়ী, একজন জেলা প্রশাসক নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে এক বছরের জন্য সরকারি খাস জায়গা অস্থায়ী বন্দোবস্ত দিতে পারেন। তবে দীর্ঘমেয়াদি (৫ বছর বা তার বেশি) ভাড়া বা ইজারা পেতে মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমোদন লাগে।
জানতে চাইলে সিডিএর দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার-২ প্রকৌশলী তানজিব হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘পরীর পাহাড়ের একাংশে স্টিল স্ট্রাকচার দিয়ে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে; বিষয়টি আমরা দেখেছি। দেখার পর আমরা জেলা প্রশাসনসহ অন্যান্য সংস্থাকে চিঠি দিয়েছি, যাতে সিডিএর অনুমোদন ছাড়া কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা না হয়। চিঠি দিয়ে অবগত করা ছাড়া জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে আর কি-ই বা করার আছে?’