রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পাক দরবার শরীফের পীর নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার (৮৫) মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের নির্দেশদাতাসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস্) মো. শরীফ আল রাজীব।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার বড় ঠাকুরকান্দি গ্রামের মাওলানা বাহাউদ্দীনের ছেলে মো. আ. লতিফ (৩৫) ও গোয়ালন্দ পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের চৌধুরী পাড়া এলাকার বিল্লাল মন্ডলের ছেলে অভি মন্ডল রঞ্জু (২৯)।
গ্রেপ্তার লতিফ হুজুর নুরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে উত্তলনের সরাসরি নির্দেশদাতা ছিলেন। তিনি গোয়ালন্দের স্থানীয় একটি মসজিদে ইমামতি করতেন।
রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস্) মো. শরীফ আল রাজীব বলেন, গোয়ালন্দের নুরাল পাগলার দরবারে বিক্ষুব্ধ জনতার হামলায় তার ভক্ত রাসেল মোল্লা নিহত হওয়ার ঘটনায় তার বাবা আজাদ মোল্লা বাদী হয়ে অজ্ঞাত ৪ হাজার জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করলে পুলিশ লতিফ হুজুর ও অভি মন্ডল রঞ্জু নামের দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তার লতিফ হুজুরকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ আজ ভোরে মানিকগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করেছে। নুরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনে সরাসরি নির্দেশদাতা ছিলেন এই লতিফ হুজুর।
তিনি আরও বলেন, এর আগে গ্রেপ্তার হওয়া অপু কাজীর আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে এই লতিফ হুজুরের বিষয় তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া, ভিডিও ফুটেজ দেখে লতিফ হুজুরের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।
উল্লেখ্য, গত ৫ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের পর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ডে নুরাল পাগলার দরবারে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালায় বিক্ষুব্ধ জনতা। এ সময় নুরাল পাগলার ভক্তদের সঙ্গে সংঘর্ষে রাসেল মোল্লা নামের এক যুবক নিহত হয় এবং দুই পক্ষের শতাধিক মানুষ আহত হয়। ওই সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে পুলিশের ওপর হামলা চালানো হয় ও গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এতে ১০ থেকে ১২ জন পুলিশ সদস্য আহত হন।
পরে নুরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেয় হামলাকারীরা। ওইদিন রাতে পুলিশের সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় গোয়ালন্দ ঘাট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সেলিম মোল্লা বাদী হয়ে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় পুলিশ এখন পর্যন্ত ১৮ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। তার মধ্যে দুইজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন।
এ ছাড়া, নিহত রাসেল মোল্লার বাবার দায়ের করা মামলায় দুইজন গ্রেপ্তার রয়েছে।
এদিকে নিহতের পিতা আজাদ মোল্লা বলেন, আমার ছেলে রাসেল সহজ–সরল প্রকৃতির। কী অপরাধ ছিল। এলাকার কেউ কখনো বলতে পারবে না রাসেল কোনোদিন কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছে। আমার নিরপরাধ ছেলেকে নির্মমভাবে দুই দফা পিটিয়ে হত্যা করেছে। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই। আজাদ মোল্লা আরও বলেন, আমার মা-বাবা নুরাল পাগলার দরবারের ভক্ত ছিলেন। তাদের সঙ্গে আমরাও দরবারের ভক্ত। রাসেল ছোটবেলা থেকে দরবারে আসা–যাওয়া করত। সে স্থানীয় একটি কোম্পানির গাড়ি চালাত। ঘটনার দিন (৫ সেপ্টেম্বর) জরুরি কাজে আমি ঢাকায় ছিলাম। বেলা ৩টার দিকে বাড়ি থেকে ফোন করে জানায় গোয়ালন্দ পাক দরবারে (নুরাল পাগলার দরবার) হামলা হয়েছে। রাসেল তখন দরবারে ছিল। বাড়ি ফেরার পথে সন্ধ্যায় জানতে পারি রাসেল মারা গেছে।
নিহত রাসেলের স্ত্রীর নাম হাসি আক্তার। তাদের চার বছর বয়সী মেয়ে ও দেড় বছর বয়সী একটি ছেলে আছে। হাসি আক্তার বলেন, শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে আমি ফোন করে তাকে (রাসেল) বাড়ি আসতে বলি। সে বলে, দরবারে আছি জুমার নামাজের পর তবারক খেয়ে বাড়ি ফিরব। বেলা ৩টার দিকে ফোন করে আবার জানায়, দরবারের পরিস্থিতি ভালো না, হামলা হয়েছে। কখন জানি কী হয়, দোয়া কইরো।
হাসি আক্তার আরও বলেন, স্থানীয় কয়েকজন রাসেলকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। জরুরি বিভাগ থেকে কয়েকজন রাসলেকে টেনে বাইরে বের করে আবার মারধর করতে থাকে, মাথায় কোপ দেয়। পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সে মারা যায়। আমার স্বামীর কী দোষ ছিল, আমার ছোট ছোট দুইটা বাচ্চার এখন কী হবে, আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই।
মেহেদী হাসান/মাহফুজ