বরিশালে নগরীর বেলস্ পার্ক (সাবেক বঙ্গবন্ধু উদ্যান) লাগোয়া ডিসি লেকের চারপাশ প্রাচীর দিয়ে বন্ধ করা হচ্ছে। এক সপ্তাহ ধরে লেকটি বন্ধের জন্য ইটের দেয়াল এবং এর ওপরে গ্রিল বসানোর কাজ করছে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পক্ষে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে আসছে। কিন্তু সুশীল সমাজের দাবি, তাদের দাবি উপেক্ষা করে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ কাজ অব্যাহত রেখেছে কর্তৃপক্ষ। এর প্রতিবাদে গত সোমবার সকাল ১০টায় নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।
স্মারকলিপি দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির (বাকশিস) কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক জলিলুর রহমান। বরিশাল সিনিয়র সিটিজেন ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী মিজানুর রহমান, বাম গণতান্ত্রিক জোট বরিশাল জেলা শাখার সমন্বয়ক শাহ আজিজ খোকন, উন্নয়ন সংগঠক দীপু হাফিজুর রহমান, কড়াপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী প্রধান শিক্ষক সোনালী কর্মকার, বাসদ বরিশাল জেলা শাখার সমন্বয়ক মনীষা চক্রবর্তী, সাবেক ছাত্রনেতা সাগর দাস আকাশ, শ্রমিকনেতা শহিদুল হাওলাদার, বাসদ বরিশাল জেলা শাখার সদস্য শহিদুল শেখ প্রমুখ।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি অধ্যাপক জলিলুর রহমান বলেন, ‘প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেঘেরা ডিসি লেকটি বরিশালের প্রাণকেন্দ্রে একমাত্র উন্মুক্ত জলাশয়। সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে নিরাপত্তা ও অসামাজিক কাজের অজুহাতে ইট ও গ্রিল দিয়ে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করছে সিটি করপোরেশন। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রকৃতিপ্রেমীরা বিকেল বেলা বেলস্ পার্কে বেড়াতে আসেন, খোলা মাঠে হেঁটে বেড়ান, পুকুরের পাড়ে বসে ঠাণ্ডা বাতাস নেন। এখানে গ্রিল ও কংক্রিটের দেয়াল বানিয়ে লেকটিকে খাঁচাবন্দি করলে এই প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট হবে। বরিশাল নগরীর মানুষের একমাত্র প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে বঞ্চিত করার কোনো যুক্তিই ঠিক নয়।’
বাসদ বরিশাল জেলা শাখার সমন্বয়ক ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, ‘লেকের পারে মাদক সেবন ও অসামাজিক কাজের কথা বলা হচ্ছে। মাদক সেবন বন্ধে নিরাপত্তা টহল বাড়ানো, লেকের চারপাশে লাইটপোস্ট দিয়ে আলো বাড়ানো যায়। অসামাজিক কাজ বন্ধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো যায়। কিন্তু খাঁচাসদৃশ দেয়াল বানিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘নাগরিকদের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে এই প্রাচীর নির্মাণ বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন, স্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচি পালন হয়েছে। সোমবার জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করব, নগরবাসীর এই দাবি জেলা প্রশাসক গুরুত্ব-সহকারে নিয়ে প্রাচীর নির্মাণ বন্ধ করবেন। একই সঙ্গে লেকের পাড়ে উন্মুক্ত ওয়াকওয়ে, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা টহল বাড়িয়ে লেকের সৌন্দর্যবর্ধন ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করবেন।’
এদিকে জেলা প্রশাসক সূত্র জানিয়েছেন, ২০১২-১৩ সালের দিকে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সে সময়ের জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে তার বাংলোর পাশের লেকটিকে গ্রিল দিয়ে ঘেরার কাজ শুরু করেন। ওই সময় সুশীল সমাজের আপত্তিতে তা বন্ধ হয়ে যায়। পরে জেলা প্রশাসকের সরকারি বাংলোর সমানে একটি ঘাটলা নির্মাণ করা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, লেকের ধারে কিশোর-কিশোরীরা আড্ডা দেয়, সেটি বর্তমান জেলা প্রশাসনের দৃষ্টিতে বাংলোর আশপাশের পরিবেশ নষ্ট করছে। সামাজিক অবক্ষয়ের যুক্তি তুলে ধরে বর্তমান জেলা প্রশাসক লেকের চারপাশে দেয়াল নির্মাণের প্রস্তাব দেন। সেই প্রস্তাব অনুযায়ী বরিশাল সিটি করপোরেশনের অর্থায়নের গ্রিল বসানোর কাজ শুরু হয়েছে।
কবি হেনরি স্বপন বলেন, ‘তরুণ-তরুণীরা অসামাজিক কিছু করে না, করার সুযোগও নেই। লেকের পাশেই ডিসি বাংলো, চারপাশে পুলিশ পাহারা, মানুষের ভিড়। প্রেমিক যুগলকে অশ্লীলতার দায়ে দোষী বানিয়ে ঐতিহ্যকে খাঁচায় পুরে দেওয়ার কোনো মানে হয় না।’
তিনি জানান, ১৮৯৬ সালে লেফটেন্যান্ট গভর্নর আলেকজান্ডার ম্যাকেঞ্জি সফরে এসে এই পার্কের উদ্বোধন করেন। পার্ক নির্মাণের সময়ে লেকটি তৈরি করা হয়। স্বাধীনতার পর এ জায়গায় সমাবেশ করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমানসহ দেশের শীর্ষ নেতারা। বেলস্ পার্কের পাশ দিয়েই চলে গেছে এই লেক। সেটি ঘিরেই এখন দ্বন্দ্ব।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল বারী বলেন, ‘নিরাপত্তার কারণেই কাজটি করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসকের অনুরোধে কমিশনার অনুমোদন দিয়েছেন।’
জেলা প্রশাসক মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘সম্প্রতি লেকের ধারে ছিনতাই ও অসামাজিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থেই সিটি করপোরেশনের অর্থায়নে প্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পিলারের ফাঁকে গ্রিল বসানো হবে। ওপরে আলো থাকবে। এতে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। যারা আন্দোলন করছেন, তারা না বুঝেই সেটা করছেন।’