কৃত্রিম নগর সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চিরায়ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রতিদিন দূষিত হচ্ছে জল, মাটি, বাতাস—নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজার জেলা, যেখানে প্রকৃতির মন ছুঁয়ে যাওয়া এক অপার সৌন্দর্য মিশে আছে প্রতিটি কোণে। কিন্তু সেই প্রকৃতির বুকে প্রবাহিত মনু নদের অবস্থা এখন করুণ। ভরাট, দখল-দূষণের ধারাবাহিকতায় নদী হারিয়েছে তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য্য আর পরিবেশগত ভারসাম্য। কোথাও বসেছে অবৈধ স্থাপনা, কোথাও আবার নদের বুকেই ফেলা হচ্ছে বর্জ্য। ফলে পরিবেশ যেমন হুমকির মুখে, তেমনি নদের অস্তিত্বও আজ সংকটে।
স্থানীয়রা বলছেন, সময় এসেছে প্রকৃতিকে রক্ষা করার, মনুকে তার স্বাভাবিক রূপে ফিরিয়ে দিতে হবে। নইলে মৌলভীবাজারের এই প্রাকৃতিক লীলাভূমি একদিন হারিয়ে যাবে কংক্রিটের শহরের নিচে।
তারা জানান, শহরের মনু নদের উত্তর পাড় চাঁদনীঘাট এবং মনু নদের দক্ষিণ পাড় সৈয়ারপুর, পশ্চিমবাজার ও বড়হাট অংশ দিন দিন দখল-দূষণের কবলে হারিয়েছে তার সৌন্দর্য্য। এই সব অংশে বসতবাড়ির ময়লা-আবর্জনা সহ পয়ঃনিষ্কাশনের পাইপলাইন রয়েছে প্রবহমান মনু নদে।
পরিবেশকর্মীদের আক্ষেপ, মনু নদের বর্তমান অবস্থা শুধু দুঃখজনক নয়, ভয়ংকর পরিবেশগত বিপর্যয়ের ইঙ্গিতও বহন করে।
সম্প্রতি সরেজমিন শহরের চাঁদনীঘাট এলাকার মনু সেতু থেকে পূর্ব দিকে মনু নদের পাড় গিয়ে দেখা গেছে, পাড়ের দক্ষিণ পাশে নদের ভেতর অংশে গড়ে উঠেছে স্থায়ী বাজার ও বসতি। এই বাজারে মাছ, কাঁচা তরকারিসহ নানান পণ্যের দোকান রয়েছে। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে এলাকাবাসী প্রকাশ্যে নদীতে ময়লা ফেলছেন। ময়লার স্তূপ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা নাঈম রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অবিক্রিত শাক-সবজির বর্জ্য, পচা মাছ পলিথিন ইত্যাদি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এসব ময়লা-আবর্জনা থেকে তীব্র গন্ধ বের হচ্ছে। বর্তমানে দখল, দূষণ ও ভরাটের কারণে নদীর অস্তিত্ব বিপন্ন।’
সৈয়ারপুর এলাকার বাসিন্দা মো. মইনউদ্দিন বলেন, ‘এখানকার নদীর পাড়ে অনেক বাসাবাড়ি আছে। সেইসব বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা নিষিদ্ধ পলিথিনে ভরে নদীতে ময়লা ফেলা হচ্ছে। দূষণের পাশাপাশি দুর্গন্ধে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা জানান, নদীর পাড়ে অনেক বাসার পয়ঃনিষ্কাশনের পাইপলাইন নদীর সঙ্গে সংযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী মানে শুধু পানি নয়, নদী মানে একটি জীবন্ত পরিবেশ। আর সেই নদীতে ফেলা বজ্য মানুষসহ সকল প্রাণীকুলের জন্য হুমকি, একইসাথে নদী তীরে উৎপাদিত ফসলের জন্য ক্ষতিকর। মনু নদের দখল-দূষণ বন্ধ না হলে মৌলভীবাজার শহরের পরিবেশ বিপর্যয় অনিবার্য। এটি এখনই থামাতে হবে। নইলে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারব না।
স্থানীয় পরিবেশকর্মী সোনিয়া মান্নান বলেন, ‘আমাদের ঐতিহ্যবাহী নদীগুলো রক্ষায় আরও সচেতনভাবে এগিয়ে আসতে হবে। নদী বাঁচলে আমাদের প্রকৃতি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে। আমরা যদি নদী নিয়ে কথা না বলি, তাহলে আমাদের নদীর যে বৈশিষ্ট্য ও চরিত্র আছে সেগুলো কিন্তু হারিয়ে যাবে।’
বাপা মৌলভীবাজারের জেলা সমন্বয়ক আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, ‘অনেক জায়গায় মনু নদ দখল হয়ে হচ্ছে, দূষণ হচ্ছে। নদের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নদীকে তার মতো চলতে দিতে হবে। নদী নিয়ে কথা বলতে হবে। এখন যদি এসব বন্ধ করতে না পারি তবে সামনে আমাদের দুর্দিন আসছে।’
নদী পাড়ে বাজার ও বিভিন্ন স্থাপনা অপসারণ এবং ময়লা আবর্জনা ফেলা রোধ হলে রক্ষা পাবে নদী, ফিরবে পরিবেশের ভারসাম্য, মত পরিবেশবিদদের।
পুলক পুরকায়স্থ/মৌসুমী/