ঈশ্বরদীর মাঠে শীতের সবজি চাষের মৌসুম শুরু হয়েছে। কৃষকরা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জমিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। কেউ কোদাল হাতে মাটি খুঁড়ছেন, কেউ ট্রাক্টর বা পাওয়ার ট্রলি ব্যবহার করে জমি প্রস্তুত করছেন। তবে সম্প্রতি অতিবৃষ্টির কারণে আগাম আবাদে মুলা, গাজর ও ফুলকপির বড় ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া পেয়ারা ও ড্রাগন ফলেও টান পড়েছে।
ক্ষতির মোকাবিলা করতে কৃষকরা এখন দেশি শিম, লাউ, ঝিঙা, বরবটি ও অন্যান্য শীতকালীন সবজির চারা ও বীজ রোপণ করছেন। উপজেলায় শীতকালীন সবজি চাষের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ হাজার ৬০০ হেক্টর জমি।
অক্টোবরের শুরুতেই রবি মৌসুমের আবাদ শুরু হয়েছে। উপজেলাজুড়ে শিম, ঢ্যাঁড়স, মুলা, গাজর, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, ধনিয়াপাতা, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, লালশাক ও পালংশাক চাষ হচ্ছে। পাশাপাশি ঈশ্বরদী দেশসেরা লিচু, পেয়ারা, কুল ও কাঁঠালের জন্য পরিচিত।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় জানিয়েছে, এ বছর শীতকালীন সবজির জন্য মোট ৭ হাজার ৬০০ হেক্টর জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ছলিমপুর, মুলাডুলি, লিকুন্ডা ও সাহাপুর ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কৃষকরা জমি প্রস্তুত করছেন প্রাণপণে। কেউ নিড়ানি হাতে আগাছা পরিষ্কার করছেন, কেউ চারা ও বীজ রোপণের জন্য উঁচু বেড বানাচ্ছেন। প্রস্তুত জমিতে ধীরে ধীরে বসছে নতুন চারা।
লিকুন্ডা ইউনিয়নের বুরামপুর গ্রামের কৃষক সেলিম হোসেন বলেন, ‘এবার আমি ৮ বিঘা জমিতে গাজরের আবাদ করেছি। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বীজ বপন করেছিলাম। ভালো ফলনের জন্য জমিতে বেড তৈরি করেছিলাম। কিন্তু ভারী বৃষ্টিতে বেড ভেঙে গাছ মাটিতে হেলে গেছে। শত শত গাছ নষ্ট হওয়ার কারণে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসবে। খরচ উঠানোও কঠিন হবে।’
সাহাপুর ইউনিয়নের চরগড়গড়ি গ্রামের কৃষক সুমন আলীও একই ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তিনি পেয়ারা, ড্রাগন ফল ও কলার পাশাপাশি সবজি চাষ করেন। তিনি বলেন, ‘আমার ৮ বিঘা জমিতে পেয়ারা, ৩ বিঘা জমিতে কলা আর ড্রাগন ফলের আবাদে বড় ক্ষতি হয়েছে। ফুল আসার সঙ্গে সঙ্গে ভারী বৃষ্টি শুরু হয়। সব ফুল নষ্ট হয়ে গেছে। কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখন শীতকালীন সবজি আবাদ শুরু করেছি। জমিতে দেশি শিম, লাউ, শসাসহ নানা সবজির বীজ লাগিয়েছি।’
ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কৃষকরা আবারও ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। মুলা, ঢ্যাঁড়স, বেগুন, শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ধনিয়াপাতা, লালশাক, পুইশাক- সব ধরনের বীজ ও চারা জমিতে রোপণ করা হচ্ছে। মাঠজুড়ে এখন নতুন মৌসুমের প্রস্তুতি দৃশ্যমান।
মুলাডুলি ইউনিয়নের কৃষক মাহফুজুল আলম বলেন, ‘শিম ও ঢ্যাঁড়স চাষের জন্য মুলাডুলি খুব পরিচিত। এবার তিন বিঘা জমিতে ঝিঙা, বটবটি ও দেশি শিম লাগালাম। মৌসুমের শুরুতে বাজারে সবজি তুলতে পারলে ভালো দাম মেলে।’
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুজন ইসলাম বলেন, ‘এখানকার কৃষকরা খুব পরিশ্রমী ও দক্ষ। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা ভেঙে পড়েন না। নতুন ফসল আবাদ করে ক্ষতি পুষিয়ে নেন। ঈশ্বরদীর উর্বরা মাটি সব ধরনের ফসল উৎপাদনের জন্য সুবিধাজনক।’
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল মমিন বলেন, ‘শীতকালীন সবজির দিকে এখানকার কৃষকরা বিশেষ নজর দেন। অক্টোবর থেকে মৌসুম শুরু হলেও সারা বছরই এখানে সবজি, ফল ও অন্যান্য ফসল হয়। কৃষকেরা মাঠ খালি রাখেন না। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ শীতকালীন সবজি উৎপাদন হবে। অতিবৃষ্টিতে কিছু ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পাশে আমরা সবসময় আছি।’