'ইয়া দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা'-অর্থাৎ, হে দেবী, তুমি সর্বভূতে শক্তিরূপে বিরাজ করছো। সেই শক্তির মন্ত্র ধারণ করেই সৈয়দপুরের সনাতনী হিন্দু সম্প্রদায়ের একদল পিছিয়ে পড়া নারী মুষ্টির চাল সংগ্রহ করে আয়োজন করছেন দুর্গাপূজার।
সৈয়দপুর উপজেলার বাঙ্গালীপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম হাঁড়িপাড়ার প্রায় ২২টি শ্রমজীবী পরিবারের নারীরা গত দুই যুগ ধরে এ উদ্যোগ চালিয়ে আসছেন। মৌসুমি কাজে পুরুষরা বাইরে গিয়ে ঢোল বাজিয়ে আয়-রোজগার করেন। আর গ্রামের মহিলারাই নিজেরা আয়োজন করেন দুর্গোৎসব। সৈয়দপুর শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে হলেও পূজার সময় পুরো গ্রাম যেনো রূপ নেয় উৎসবমুখর পরিবেশে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মণ্ডপজুড়ে নারীদের ব্যস্ততা। ঢাক-ঢোল, নাচ-গান, পূজা-অর্চনা আর উলুধ্বনিতে মুখরিত থাকে চারপাশ। পুরুষশূন্য গ্রামে তখন আনন্দে মেতে ওঠেন শিশু, কিশোরী ও নারী।
পূজার আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয় বছরজুড়ে। প্রতিটি পরিবার থেকে নিয়মিত সংগ্রহ করা হয় এক মুঠো চাল। সেই চাল বিক্রি করেই মূল খরচ মেটানো হয়। পাশাপাশি সহযোগিতা আসে স্থানীয় সুধীজন ও প্রশাসনের পক্ষ থেকেও।
হাঁড়িপাড়া পূজা উদযাপন কমিটির সম্পাদক অঞ্জু রানী জানান, “এ বছর ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় পূজার আয়োজন করতে অনেক কষ্ট হয়েছে। সরকারের অনুদান হিসেবে পাওয়া চাল, মুষ্টির চাল বিক্রি এবং বিভিন্ন ব্যক্তির সহযোগিতায় আমরা পূজা করছি। টাকার ঘাটতি হলে ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখা চাল দিয়েই তা পূরণ করা হয়। গ্রামের পুরুষরাও কিছু সহযোগিতা করে।”
কমিটির সভাপতি সনেকা রানী বলেন, “আমরা মহিলারাই মিলেমিশে পূজার আয়োজন করি। পূজা কমিটির সবাই নারী। অর্থাভাবে পুরোনো মণ্ডপঘরটি সংস্কার করা যায়নি। টিনের চালার ফুটো দিয়ে আকাশ দেখা যায়। তাই আমরা এবার মন্দির ঘরের বাইরে প্রতিমা স্থাপন করছি।”
স্থানীয় গৃহবধূ বানী রানী স্মরণ করে বলেন, “গত বছর অর্থাভাবে শুধু শামিয়ানা আর আলোকসজ্জা দিয়েই পূজা পালন হয়েছিল। ফলে গ্রামের বধূ ও শিশুরা আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। তবে এবার আয়োজনটি কিছুটা হলেও পরিপূর্ণ হয়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা রমনী মালী বলেন, “এই গ্রামের পুরুষরা ঢাক বাজাতে বিভিন্ন মণ্ডপে চলে যায়। দুর্গাপূজার সময় কেউ বাসায় থাকে না। তাই দুর্গাপূজার জন্য গ্রামের নারীরাই উদ্যোগ নিয়েছেন এবং নিজেরাই মুষ্টির চাল সংগ্রহ করে পূজার আয়োজন করেছেন।”
সৈয়দপুর হিন্দু কল্যাণ সমিতির সভাপতি সুমিত কুমার আগারওয়ালা বলেন, “হাঁড়িপাড়ার নারীরা প্রায় দুই যুগ ধরে মুষ্টির চাল সংগ্রহ করে পূজার আয়োজন করছে। এটি দেবী দুর্গার কৃপা এবং নারীশক্তির অনন্য দৃষ্টান্ত। কল্যাণ সমিতি থেকেও তাদের সহযোগিতা করা হয়েছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুর ই আলম সিদ্দিকী বলেন, “আমি বিষয়টি জানি। এখানে নারীরাই পূজার আয়োজন করেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।”
এভাবেই বছরের পর বছর মুষ্টির চালের শক্তি আর নারীদের ঐক্যেই টিকে আছে হাঁড়িপাড়ার দুর্গোৎসব, যা আজ গ্রামীণ সাম্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
আজাদ/রিফাত/