২০১৯ সালের জুন থেকে ২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের খননকাজ শুরু হয়। গাইবান্ধা, জামালপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও কিশোরগঞ্জ- এ পাঁচ জেলায় নদের ২২৭ কিলোমিটার অংশ খনন করার কথা। খনন প্রকল্পের কাজ ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যথাসময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়। ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এই প্রকল্পের মাত্র ৩৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়। এর পর খননের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর জন্য আবেদন করা হয়।
সেই অনুযায়ী দুই বছর মেয়াদ বাড়ানোয় প্রকল্পটি শেষ হবে ২০২৭ সালে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নদ খননের কাজটি বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্পে বলা হয়েছিল, খননের পর নদে শুষ্ক মৌসুমেও ১০ ফুট পানি থাকবে। নদের প্রশস্ততা হবে কমপক্ষে ১০০ মিটার। বলা হয়েছিল, প্রকল্প শেষ হলে এই নদ দিয়ে জাহাজ চলাচল করবে। আন্তর্জাতিক নৌরুট হিসেবে ব্যবহৃত হবে এই নদ। এ ছাড়া উন্নয়ন ঘটবে মৎস্যসম্পদের। এতে বদলে যাবে নদের দুই পাড়ের মানুষের জীবনধারা। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখনো ধোঁয়াশায় ঘেরা। কারণ প্রকল্প শুরুর ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও নদে শুকনো মৌসুমে পানি নেই।
এদিকে বর্ষা মৌসুম ছাড়া সব স্থান দিয়ে নৌকা চলে না। খনন করা অংশে জাগছে চর। পানির প্রবাহ না বাড়ায় ড্রেজিংয়ের পর অনেক স্থানে নদটি পরিণত হয়েছে সরু খালে। অনেক স্থান দিয়ে গৃহপালিত পশুর পাশাপাশি মানুষও হেঁটে পারাপার হচ্ছে। বালুর স্তূপ পাহাড় হয়ে জমে আছে নদের তীরেই। অথচ কোথাও অপরিকল্পিতভাবে নদ খননের মধ্যেই ড্রেজিংয়ের বালু ফেলে, আবার কোথাও জমি দখল করার জন্য মূল প্রবাহ সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে নদীভাঙনে বাড়িঘর ও ফসলি জমি হারিয়েছে শত শত মানুষ। যেখানে সেখানে বালু তোলায় বিভিন্ন স্থানে বর্ষায় দেখা দিচ্ছে নদীভাঙন। এ ছাড়া স্থানীয় প্রভাবশালীর ছত্রছায়ায় চলছে বালু লুটপাট।
অন্যদিকে দীর্ঘ বছরেও আশানুরূপ খনন না হওয়া এবং নদে নাব্য ফিরে না আসায় নাগরিকরা ক্ষুব্ধ। এ নিয়ে তারা অনেকবার মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন। জেলা প্রশাসক বরাবর দিয়েছেন স্মারকলিপি। সচেতন নাগরিকরা বারবার জানাচ্ছেন, ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষের ছিল গভীর মিতালি। নদকেন্দ্রিক জীবিকা নির্বাহ করতেন বহু মানুষ। জেলেরা জাল ফেললে ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়ত ছোট-বড় মাছ। উত্তাল পানিতে চলাচল করত বড় বড় জাহাজ। নদের আশপাশের বাজারগুলো ছিল জমজমাট। তবে এসব দৃশ্য এখন শুধুই কল্পনা। নদ খনন শুরু হওয়ায় মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল। নদটিতে সারা বছর পানি থাকার পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমে উত্তাল হবে, এমনটি চেয়েছিল সবাই। তবে খননের পর ফলাফল শূন্য হওয়ায় নাগরিকরা এখন বলছেন, যথাযথভাবে নদ খনন করা হচ্ছে না। খননের নামে নদের সর্বনাশ করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রকল্পটির নামে চলছে সরকারি অর্থ লুটপাটের মচ্ছব।
তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, উৎসমুখ খনন করতে না পারলে শুষ্ক মৌসুমে পানি আসবে না। উৎসমুখটি ২৩-২৪ ফুট উঁচু। ভরা বর্ষায় পানি ভরাট হওয়া স্থানে পানি ময়মনসিংহের দিকে আসে। ভরাট হওয়া অংশ প্রায় ৩৬ কিলোমিটার।
এর মাঝে গাইবান্ধা জেলায় পড়েছে সাত কিলোমিটার। আর জামালপুর অংশে পড়েছে ২৯ কিলোমিটার। দুই অংশেই খননকাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় দুই থেকে তিন কিলোমিটার পরপর বসানো হয়েছে ৯৬টি ড্রেজার মেশিন। বর্তমানে ময়মনসিংহ জেলায় ৯০ কিলোমিটার এলাকায় খনন চলছে। ২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকার প্রকল্পটিতে এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার মতো। এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি প্রায় ৫০ শতাংশ।
নগরীর কাচারিঘাট এলাকায় নৌকা চালান আবদুস সালাম। তিনি বলেন, ‘নদের যে স্থানে খনন করা হয়েছে, শুষ্ক মৌসুমে সেই স্থান দিয়েও নৌকা চলানো যায় না। বর্ষায় পানি বাড়লে নৌকা চালাতে সুবিধা হয়। অনেক স্থান দিয়ে মানুষ হেঁটে চলাচল করে। খনন করলে ঠিকঠাক খনন করা প্রয়োজন। তা না হলে ড্রেজিংয়ের নামে অহেতুক তামাশা করার প্রয়োজন নাই।’
ব্রহ্মপুত্র সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘খননের নামে ব্রহ্মপুত্রসহ নির্ভরশীল শত শত নদী ও খালকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এর একাধিক ধারা বন্ধ করা হয়েছে। খননের নামে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাদ দিয়ে খননের নামে হরিলুট করা টাকাগুলোও উদ্ধার করার দাবি জানাচ্ছি।’
প্রকল্প পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, ‘উৎসমুখে সবার সহায়তায় খননকাজ শুরু হয়েছে। নদের খননকাজ শেষ হলে মানুষ এর সুফল পাবে।’
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মুফিদুল আলম বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গার বালু কিছু অসাধু চক্র চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আর বিআইডব্লিউটিএর খনন ঠিকভাবে চলছে কি না, এটি তাদের প্রকৌশলীরা ভালো বলতে পারবেন।’