রেলের টিকিটের অনিয়ম ও কালোবাজারি ঠেকাতে ২০১২ সালে চালু করা হয় ই-টিকিটিং সিস্টেম। তবে কালোবাজারিরা এই সিস্টেমকে কাজে লাগিয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বিভিন্নজনের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে টিকিট বিক্রি করছে স্যোশাল অ্যাপে ও সরাসরি। এনআইডি জালিয়াতির মাধ্যমে পূর্বাঞ্চল রেলে লাগামহীনভাবে চলছে টিকিট কালোবাজারি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চারটি স্টেশনে কালোবাজারি চক্র নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ রয়েছে জেলার কসবা উপজেলার ধর্মপুর গ্রামের তানভীর পাঠান ওরফে রাজীব পাঠান নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে। সে ধর্মপুর গ্রামের জাহাঙ্গীর পাঠানের ছেলে। টিকিট কালোবাজারি করেই মাসে কয়েক লাখ টাকা আয় তার।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কসবা, আখাউড়া ও আজমপুর রেলস্টেশনে নিয়মিত টিকিট কালোবাজারি হয়। এই চক্রে সক্রিয় অন্তত ৩০ জন, যার নিয়ন্ত্রণ রাজীবের হাতে। চক্রটি বিভিন্নজনের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে নিয়মিত টিকিট কেটে তা বিক্রি করে কালোবাজারে। অনুসন্ধানে প্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট রুটে প্রায় ৪০০ টিকিট বিক্রির তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে অন্তত ২০০ টিকিট বিক্রি করে রাজীব পাঠান নিয়ন্ত্রিত চক্রের সদস্যরা।
তারা পরিচিতজন ছাড়াও আশপাশের গ্রামবাসীর এনআইডি নম্বরও কবজা করেছে।
কালোবাজার থেকে কেনা বেশ কিছু টিকিটে উল্লিখিত এনআইডি নম্বর ঘেঁটে দেখা গেছে, অধিকাংশ এনআইডিধারী জানেনই না তাদের নামে রেলসেবা অ্যাপে অ্যাকাউন্ট খুলে টিকিট কেটে বিক্রি করছে কালোবাজারিরা।
কসবা উপজেলার বুগীর গ্রামের বাসিন্দা সোহেরা বেগমের এনআইডি কার্ড জালিয়াতি করে দীর্ঘদিন ধরে ট্রেনের টিকিট বিক্রি করছে কালোবাজারিরা। অথচ জীবনে কখনো ট্রেনেই ওঠেননি তিনি। তার কোনো স্মার্টফোনও নেই।
সোহেরা বেগম বলেন, ‘আমি বড় কোনো গাড়িতে উঠতে ভয় পাই। ট্রেনে কোনো দিন উঠিনি। টাচ ফোনও চালাতে পারি না। বাটন ফোন ব্যবহার করি।’
এনআইডি জালিয়াতির শিকার ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বাসুদেব ইউনিয়নের কোড্ডা গ্রামের রেজাউল হক রিপন ভূঁইয়া জানান, কালোবাজারিরা তার এনআইডি নম্বর ব্যবহার করে টিকিট কেটে কালোবাজারে বিক্রি করে। এ জন্য তিনি নিজে রেলসেবা অ্যাপে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে তিনি নিজেও কালোবাজারিদের কাছ থেকে টিকিট কেনেন। তবে কীভাবে কালোবাজারিরা তার এনআইডি নম্বর পেয়েছে, তা জানেন না বলে জানান তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালোবাজারি চক্রের এক সদস্য জানায়, ভোটার তালিকা এবং ফটোকপির দোকান থেকে এনআইডি নম্বর সংগ্রহ করে চক্রের সদস্যরা। প্রতিদিন তারা বিভিন্ন রুটের লক্ষাধিক টাকার টিকিট বিক্রি করে। দ্বিগুণ দামে টিকিট বিক্রির টাকা চক্রের সদস্যদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কসবা এবং আজমপুর রেলস্টেশনে কালোবাজারি চক্রের নিয়ন্ত্রণ রাজীব পাঠানের হাতে বলে জানান তিনি।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে রাজীব পাঠান বলেন, ‘আমি টিকিট দিইও না, নিইও না। আমি টিকিট কোনো সময়ই বিক্রি করিনি। কোনো একসময় হিরণকে (কালোবাজারি) দিতাম। সোহেল ভাই (কালোবাজারি) ছিল আখাউড়ার- তারা আমার কাছ থেকে নিতেন। সোহেল ভাই বিদেশ চলে গেছেন চার-পাঁচ বছর। আর হিরণের সঙ্গে আমার কথা হয় না দুই-তিন বছর।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনের সহকারী মাস্টার মো. সাকির জাহান বলেন, ‘টিকিট যার, ভ্রমণ তার’- নিশ্চিতে ট্রেনে নিয়মিত চেকিং চলে। তবে কোনো কালোবাজারি যদি অনলাইনে টিকিট কাটে- সেটি ধরার উপায় নেই। কারণ সার্ভার তো জানে না কোনটা যাত্রীর এনআইডি আর কোনটা কালোবাজারির। এ ছাড়া প্ল্যাটফর্মের বাইরে কালোবাজারি হলে সেটির দায় রেলওয়ের নয়।
আখাউড়া রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হয়। বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। রাজীব পাঠানের কালোবাজারি চক্র নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আমরা তথ্য পেয়েছি। এর আগে তার দুই এজেন্টকে টিকিটসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকেও নজরদারিতে রাখা হয়েছে। যেকোনো সময় গ্রেপ্তার করা হবে।’