শীত এখনও শুরু না হলেও ঝিনাইদহের ছয় উপজেলার গ্রামাঞ্চলের গাছিরা রস সংগ্রহের জন্য আগাম খেজুর গাছ পরিচর্যা শুরু করেছেন। সকাল ও সন্ধ্যায় কিছুটা শীত পড়তে শুরু করেছে এতে বোঝা যাচ্ছে শীত আগমনের বার্তা।
আগাম প্রস্তুতিতে গাছিদের খেজুর গাছ পরিষ্কার, চা ছা ছোলার কাজে ব্যস্ততা বেড়েছে। তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে চরম ব্যস্ততা। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খেজুর রসের মিষ্টতাও বাড়বে। শীতের শুরুতে খেজুরের রস ও সুস্বাদু পাটালি গুড় পাওয়া যাবে। আবহমান কাল থেকে গৃহিণীরা সুস্বাদু পিঠা, পায়েস তৈরিতে খেজুরের রস ও গুড় ব্যবহার করে থাকেন। খেজুর গাছ থেকে শুধু রসই নয়, রস জ্বালিয়ে নলেন গুড়, পাটালিসহ বিভিন্ন গুড় উৎপাদন করা হয়।
কয়েকদিন পর নলি স্থাপনের মাধ্যমে শুরু হবে সুস্বাদু খেজুর রস সংগ্রহ। ঝিনাইদহ সদর, হরিণাকুন্ডু, শৈলকূপা, কালীগঞ্জ, কোটচাঁদপুর ও মহেশপুর উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলের গাছিরা আগাম খেজুরগাছ গুলো প্রস্তুত করা শুরু করেছেন।
মৌসুমের শুরুতে রস ও গুড় উৎপাদন করতে পারলে গাছ মালিকরা ভাল দাম পাবেন এবং অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হবেন এমনটাই আশা করছেন তারা।
সন্ধ্যার আগে শুরু হয় গাছ পরিচর্যার কাজ। কাক ডাকা ভোরে শুরু হয় রস সংগ্রহ। সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ, গাছি ও ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন গুড়।
সাধারণত, খেজুর রস সংগ্রহের মৌসুম শুরু হয় নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি থেকে। কিন্তু গত কয়েক বছর থেকে আবহাওয়ার পরিবর্তন আসায় অনেক গাছি অক্টোবরের শুরু থেকেই গাছ প্রস্তুত করতে শুরু করেছেন।
হরিনাকুণ্ডু এলাকার গাছি শহিদুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, এ বছর এখনো পুরোপুরি শীত শুরু হয়নি। আগাম গাছ প্রস্তুত করলে বেশি রস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাতে দামও ভালো পাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, খেজুরের রস ও গুড়ের চাহিদা শহরাঞ্চলে অনেক বেশি। অনেকে অগ্রীম অর্ডার দিয়ে কিনে নেন, ফলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে প্রস্তুতি আগেই নিতে হয়।
উপজেলার পায়রাডাঙ্গা গ্রামের গাছি সরোয়ার হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, এই সময়টা আমাদের জন্য ভালো সময়। গাছে ঠিকমতো রস আসলে দুই-তিন মাসের আয়ে সারা বছর চলে যায়। তাই শীত শুরু হওয়ার আগেই গাছ প্রস্তুত করে নিচ্ছি।
আগে অধিকাংশ পতিত জমি, রাস্তার দুপাশ, ক্ষেতের আইল ও ঝোপঝাড়ের পাশে অসংখ্য খেজুর গাছ ছিল। খেজুর গাছ আমাদের দেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে মিশে আছে। খেজুর পাতা জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার হয়ে থাকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও কালের বিবর্তনে বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ এখন বিলুপ্তির পথে।
খেজুর রস সংগ্রহ শুধু একটি মৌসুমি পেশাই নয়, গ্রামীণ বাংলার এক ঐতিহ্য। তবে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে এবং গাছের যত্ন নিশ্চিত করেই এ ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, ঝিনাইদহের খেজুর গুড় ও পাটালির সুনাম রয়েছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। শীত যত ঘনিয়ে আসবে, ততই বাড়বে খেজুর রসের চাহিদা। আর তারই প্রস্তুতিতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলার শত শত গাছি পরিবার।
তবে কৃষি অফিস বলছে খেজুর গাছ আগাম প্রস্তুত করার সময় সচেতন না হলে গাছের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
হরিণাকুন্ডু উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শরীফ মোহাম্মদ তিতুমীর খবরের কাগজকে জানান, গাছ থেকে রস সংগ্রহেরও একটা নির্দিষ্ট মৌসুম আছে। বেশি আগাম গাছ কাটা হলে অনেক সময় গাছ শুকিয়ে যায় বা রস উৎপাদন কমে যায়। ছোট গাছ প্রস্তুত করলে রস উৎপাদন কমে যায়।
খেজুর রসের মিষ্টি ঘ্রাণে দ্রুতই ভরে উঠবে ঝিনাইদহের ছয় উপজেলার গ্রামাঞ্চলের বাতাস।
মাহফুজুর রহমান/নাঈম