জলের জাদুখ্যাত সীমান্ত নদী সুনামগঞ্জের যাদুকাটা বালুমহালে নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলন বন্ধে জেলা প্রশাসনের অভিযান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দুটো অভিযানে ১০ জন শ্রমিককে আটক করে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। নদীর পাড় কাটার মালিকদের রেখে দিনমজুরকে দণ্ড দেওয়ায় অভিযানটি ‘উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে’ বলে সামলোচিত হচ্ছে। স্থানীয় লোকজন বলছেন, প্রশাসনের ‘উদো-বুধোকাণ্ড’!
জানা গেছে, ১২ অক্টোবর প্রথম অভিযান হয়। এতে আটক করা হয় ছয় শ্রমিককে। যাদুকাটা তীরের লাউড়েরগড় এলাকায় জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে আটকদের ভ্রাম্যমাণ আদালেতের মাধ্যমে দুই মাস করে কারাদণ্ড দেন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এস এম ইয়াসির আরাফাত। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ অনুযায়ী এ দণ্ড দেওয়া হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত ৬ দিনমজুর হচ্ছেন, চরগাঁও খাসতাল গ্রামের আলী হোসেন (২২), আবুল বাশার (৩০), নবীর হোসেন (২০), সাজ্জাদ মিয়া (২৩), কুকুরকান্দি গ্রামের শাকিল আহমেদ, হৃদয় শাহ (২৪)। আটকের সময় তাদের কাছ থেকে অনুমান ৩০০ ঘনফুট বালুসহ দুটি স্টিলের নৌকা জব্দ করা হয়।
১৩ অক্টোবর ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের সহকারি কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান হৃদয় পরিচালিত অভিযানে আটক চার শ্রমিককে দুই মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অভিযানকালে একটি বালুভর্তি স্টিলবডি বাল্কহেড (আম্বর আলী নৌ পরিবহন) জব্দ করে তাহিরপুর থানার জিম্মায় রাখা হয়। অভিযানে পরিবেশ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জ জেলার সহকারি পরিচালক মোহাইমিনুল হক ও বাদাঘাট পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা অংশ নেন।
শ্রমিক দণ্ডে প্রশাসনের এ পদক্ষেপকে এলাকাবাসী ‘উদো-বুধো কাণ্ড’ বলে অভিহিত করছেন। তবে এ প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য না করে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান মানিক অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান।
তিনি বলেন, নদীর পাড় সুরক্ষা এবং অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে এ অভিযান হচ্ছে। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনের ৪ ধারায় ৪টি মামলা করা হয়েছে।
এদিকে এলাকাবাসী জানিয়েছেন, গত পাঁচ দিনে যাদুকাটা নদীর আড়াই কিলোমিটার এলাকার প্রশস্ততা ৩০ ফুটেরও বেশি বেড়েছে। সিলেটের সাদাপাথরের মতোই আলোচিত এই সীমান্ত নদীর পাড় কেটে এই পাঁচ দিনে লুট হয়েছে কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকার বালু। শনিবার থেকে মঙ্গলবার (১১ থেকে ১৪ অক্টোবর) পর্যন্ত বালু লুটের উৎসব হয়েছে। সীমান্ত এলাকা হওয়ায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) স্থানীয় ক্যাম্প থেকে একজন ম্যাজিস্ট্রেটসহ যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প বসানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্থানীয় লোকজন জানান, মঙ্গলবার রাত ১২টার পর হঠাৎ করেই দুই থেকে আড়াই হাজার বাল্কহেড প্রবেশ করে যাদুকাটায়। একেকটি বাল্কহেড ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক ছিল। এদের দেখে মনে হয়েছে আগে থেকে পরিকল্পনা করে একসঙ্গে ঢুকেছে তারা। এরা তাহিরপুর সীমান্তের সবচেয়ে বড় বিজিবি ক্যাম্পের (লাউড়েরগড়) কাছাকাছি স্থান থেকে নদীরপাড়ের সাহিদাবাদ পর্যন্ত পাড় কাটা শুরু করে। একইভাবে বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র এবং শনিবারও পাড় কেটেছে তারা। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবিও। বিজিবির পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে পরদিন জেলা প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হয়।
সুনামগঞ্জ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্ণেল জাকারিয়া কাদির সাংবাদিকদের জানান, ৯ অক্টোবর সব ঘটনা জানিয়ে জেলা প্রশাসনকে চিঠি দিয়েছি। পাড় কাটা ঠেকাতে হলে পুলিশ, আনসার ও বিজিবির যৌথ ক্যাম্প বসাতে হবে ওখানে।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেছেন, ‘যাদুকাটার পাড় কাটার ঘটনায় ইজারাদারকে শোকজ করা হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ইজারা বাতিল হবে।’
প্রসঙ্গত, বিশ্ব নদী দিবসে যাদুকাটা নদী নিয়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর খবরের কাগজে ‘বালুচাপা ‘জলের জাদু’ শিরোনামে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। নদীটির উৎস সীমান্তের ওপারের সুউচ্চ পাহাড়। সবুজ পাহাড় বর্ষায় নীলাকার ধারণ করে। বড় বড় পাথরখণ্ড থেকে গড়িয়ে পড়া জলের ধারা বা পাথর কাটা জলপ্রবাহ নদীটির প্রাণ। স্বচ্ছ নীল জলের নীরব ও নিরবধি প্রবাহে তৈরি জলপ্রকৃতিই ‘জলের জাদু’।
এ নদীতে দুটো বালুমহাল রয়েছে। একটি এবার ইজারা দেওয়ায় নদীর তীর যত্রতত্র কেটে নদীর আকৃতি ও গতিপ্রকৃতি পরিবর্তনের অভিযোগ উঠে। যান্ত্রিক উপায়ে বালু উত্তোলনে পর্যটনকেন্দ্র শিমুল বাগান, বারেক টিলা, শাহ আরেফিন সেতু, বিজিবি ক্যাম্প, লাউড়েরগড় বাজার, বিন্নাকুলী বাজার, ইসকন মন্দির, অদ্বৈত আখড়া, ঘাগটিয়া, সাহিদাবাদ, লাউড়েরগড়, গড়কাটি, মোদেরগাঁও, পাঠানপাড়া, মানিগাও, কুনাটছড়া, সোহালা, মিয়ারচর ও সত্রিশ গ্রামের অসংখ্য ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।
এ অবস্থায় যাদুকাটা নদীর বালুমহাল বিলুপ্ত করে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার দাবি তুলেছে পরিবেশবাদী সংগঠন।
গত ৮ অক্টোরব এ দাবিতে সিলেট নগরীতে মানববন্ধন করেছে ‘যাদুকাটা নদী রক্ষা আন্দোলন’ এবং পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা নামের দুটো সংগঠন।
অমিয়/