মাত্র ২৫ বছর বয়সে জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে সমাজে ব্যতিক্রমী উদাহরণ হয়ে উঠেছেন মোছা. সুলতানা খাতুন। পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার বনয়ারীনগর ইউনিয়নের সোনাহারা গ্রামে তার বাড়ি। পেশায় তিনি একজন ভ্যানচালক। হ্যাঁ, একজন নারী চালক, যিনি ভ্যান চালিয়ে নিজের সংসার চালাচ্ছেন। সমাজের তাচ্ছিল্য, কটূক্তি বা বাধা তাকে থামাতে পারেনি। তিনি এক হাতে সংসার চালাচ্ছেন এবং নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিচ্ছেন।
তার জীবনের শুরুটা ছিল কষ্টের, কিন্তু এখন তা অনুপ্রেরণার গল্প। সুলতানা খাতুন দিনমজুর মুনতাজ আলী ও গৃহিণী বেলে খাতুনের সন্তান। দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠায় ছোটবেলা থেকেই তিনি জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। অভাবের কারণে লেখাপড়াও বেশি দূর এগোয়নি।
তিন বছর আগে পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয় ফরিদপুর উপজেলার বিলচাদু গ্রামের এক যুবকের সঙ্গে। শুরুতে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও শিগগিরই তিনি জানতে পারেন, তার স্বামী মাদকাসক্ত। এরপর শুরু হয় নির্যাতন, অশান্তি আর চরম অভাব। সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলে সুলতানা বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তার নতুন পথচলা- সংগ্রাম ও আত্মনির্ভরতার দিকে।
বাবার বাড়িতে ফিরে কাজ না পেয়ে সুলতানা প্রথমে অন্যের ভ্যান ভাড়া নিয়ে চালাতে শুরু করেন। ভোরে বেরিয়ে দিনভর যাত্রী পরিবহন করে যা আয় হতো, তার বেশিরভাগ দিতে হতো ভ্যানের মালিককে। তবু তিনি হাল ছাড়েননি। নিরলস পরিশ্রম করে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন।
এ সময় তার মা-বাবা সিদ্ধান্ত নেন মেয়ের জন্য একটি নিজস্ব ভ্যান কিনে দেওয়ার। ধারদেনা ও কিস্তিতে টাকা জোগাড় করে তারা সুলতানার হাতে তুলে দেন একটি পুরোনো ভ্যান। এটি যেন কেবল একটি যানবাহন নয়, তার নতুন জীবনের চাবিকাঠি।
প্রতিদিন সকালে উঠে সুলতানা তার ভ্যান নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। পাবনার বিভিন্ন এলাকায় যাত্রী ও মালামাল পরিবহন করেন। দিনে তার আয় হয় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা, কখনো কখনো তার চেয়ে কম বা বেশি। এই আয় দিয়ে তিনি নিজের খরচ, বাবা-মায়ের প্রয়োজন এবং ছোট ভাইবোনের কিছু চাহিদা মেটান।
তিনি বলেন, ‘শুরুতে মানুষ হেসেছে, বলেছে- মেয়ে হয়ে ভ্যান চালাচ্ছ? এখন আর কেউ কিছু বলে না। বরং অনেকে বলে, তুই পারছিস, তোর জন্য গর্ব হয়।’
তার এই কথায় লুকিয়ে আছে এক নারীর জয়ের গল্প, সমাজকে চুপ করিয়ে দেওয়ার দৃঢ় বার্তা। প্রথম দিকে গ্রামের অনেকে তাকে দেখে লজ্জা পেত, কেউ কেউ অশালীন মন্তব্য করত। কিন্তু এখন সেই সুলতানাই তাদের চোখে সম্মান ও গর্বের প্রতীক।
প্রতিবেশী মো. আলমগীর বলেন, ‘আগে মেয়েটিকে দেখে কষ্ট হতো, লজ্জাও লাগত। এখন ওকে দেখলে গর্ব হয়। নিজের পরিশ্রমে সংসার চালানো সহজ কথা নয়।’
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক শাকিরুন নাহার বলেন, ‘সুলতানার মতো সাহসী নারীরা সমাজে পরিবর্তন আনে। সে অন্য নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা।’
সুলতানার মা বেলে খাতুন বলেন, ‘আমার মেয়ে ছোটবেলা থেকেই কষ্টে বড় হয়েছে। এখন ভ্যান চালিয়ে সংসার চালায়। অনেকে হাসলেও আমি গর্ব করি। ওর মতো মেয়ে কজনের ভাগ্যে জোটে?’
স্থানীয় সুশীল সমাজ মনে করে, রাস্তায় গাড়ি চালানো একজন নারীর জন্য কঠিন এবং নিরাপত্তাহীনতার বিষয়। তারা বলেন, সুলতানার মতো নারীরা যেন টিকে থাকতে পারে ও সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে, তার জন্য সরকার বা বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত।
পাবনা প্রেস ক্লাবের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি মীর্জা আজাদ বলেন, ‘সুলতানা খাতুন শুধু একজন নারী ভ্যানচালক নন, তিনি নারীর সক্ষমতা, আত্মসম্মান ও সংগ্রামের জীবন্ত প্রতীক। তিনি
দেখিয়েছেন, ইচ্ছাশক্তি ও সাহস থাকলে কিছুই অসম্ভব নয়। তাকে একটি ভালো মানের ইঞ্জিনচালিত ভ্যান, ছোট ব্যবসার পুঁজি বা নিরাপদ কর্মপরিবেশ দিতে পারলে তিনি আরও ভালোভাবে জীবন গড়তে পারবেন।’
এ সমাজে এমন অসংখ্য সুলতানা খাতুনের জন্ম হোক, যারা লড়াই করে নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে নেবে, স্বপ্ন বুনবে এবং সমাজকে দেখিয়ে দেবে- নারী মানেই দুর্বলতা নয়, বরং শক্তির উৎস।
পার্থ হাসান/সুমন/